Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

ইউনানে ইয়ুথ ক্যাম্পে অংশ নিলেন ঢাবি শিক্ষার্থীরা

মোঃ রাগীব রহমান

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ০২:৪৪ এএম, ৮ নভেম্বর ২০১৭ বুধবার | আপডেট: ০১:৪০ পিএম, ১৫ নভেম্বর ২০১৭ বুধবার

ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্বকারী দল

ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্বকারী দল

ইউনান বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সংস্কৃতি বিনিময় চুক্তির অংশ হিসেবে ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনায় এবং চীনা দূতাবাস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়স্থ কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের যৌথ অর্থায়নে গত ১২ থেকে ২৫শে সেপ্টেম্বর ‘বাংলাদেশ-চীন ইয়ুথ সামার ক্যাম্প-২০১৭’ এ অংশগ্রহণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৫ জন শিক্ষার্থী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং শান্ত মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এতে অংশগ্রহণ করে।

১২ই সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় ‘কুনমিং চেংশুই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ এ অবতরণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দল। বিমানবন্দরেই ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বেচ্ছাসেবকবৃন্দ ফুল ও ব্যানার হাতে শুভেচ্ছা জানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দলকে। বিমানবন্দর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে করে নিয়ে যাওয়া হয় নির্ধারিত হোটেলে; যা প্রাদেশিক রাজধানী কুনমিংয়ে অবস্থিত ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাসের পাশেই অবস্থিত।

পরদিন সকালে ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী চীনের ঐতিহ্যবাহী ‘ড্রাগন ড্যান্স’ এর মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বরণ করে নেয়। এরপর চীন ও বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত বাজিয়ে শুরু হওয়া পরিচিতিমূলক অনুষ্ঠানে পুরো ক্যাম্পের কার্যাবলি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক ধারণা দেয়া হয়।

ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের `ড্রাগন ড্যান্স` পরিবেশনা

১২ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এই ক্যাম্পে চীনা ভাষা, সংস্কৃতি, চীনাদের প্রচলিত বিভিন্ন প্রতীক, চীনা সভ্যতার ইতিহাস, বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পরিচিতি, চীনা সঙ্গীতের ইতিহাস ইত্যাদি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদেরকে ধারণা দেয়া হয়। শিক্ষার্থীদের জন্য ছিলো চীনের ঐতিহ্যবাহী তা কুংফু ফ্যান, তাইচি, ক্যালিগ্রাফি ইত্যাদির উপর ব্যবহারিক ক্লাস। বিভিন্ন চাইনিজ গেম, মুরগী বনাম ঈগল, এক সারিতে পাঁচ ইত্যাদি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা কর হয়। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবিশাল লাইব্রেরি, উইউনান ইউনিভার্সিটি সায়েন্স পার্ক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ পরিদর্শন করে ক্যাম্পে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা। একটি টেলিভিশন স্টেশনের যা যা থাকা প্রয়োজন; যেমন- এডিটিং, মনিটরিং প্যানেল, ক্যামেরা, নিউজ প্রেজেন্টেশন রুম- তার সবই আছে সেখানকার সাংবাদিকতা বিভাগে। সংস্কৃতি বিনিময় কর্মসূচির অংশ হিসেবে চীনের প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন এবং শিক্ষাদান পদ্ধতি সম্পর্কেও ধারণা দেয়া হয়।

`বাংলাদেশ-চীন ইয়ুথ সামার ক্যাম্প-২০১৭` এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে

 

চীনের ঐতিহ্যবাহী `তা কুংফু ফ্যান` এর প্রশিক্ষণ শেষে ঢাবি শিক্ষার্থীদের একাংশ

আর ছুটির দিনগুলিতে শিক্ষার্থীদের জন্য বোটিং, ক্যাবল কারে চাংশান মাউন্টেন দেখা, থ্রি প্যাগোডা, ন্যাশনালিটি ভিলেজ, স্টোন ফরেস্ট, ইরইউয়ান লেক, ইউনানের পুরনো রাজধানী শহর ত্বালি, বাই মেডিসিন ফ্যাক্টরি প্রভৃতি স্থান পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়। চারিদিকে উঁচু উঁচু পাথর দিয়ে গড়ে ওঠা ‘স্টোন ফরেস্ট’, মাটি আর কাঁদায় তৈরি ১৬ তলা সুউচ্চ প্যাগোডা কিংবা কুনমিং থেকে ৩০০ কিমি দূরবর্তী পাহাড় আর মেঘের মিলনের শহর ত্বালির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিস্ময়াভিভূত নয়নে সকলে উপভোগ করে। শিক্ষার্থীদের বিশেষ অনুরোধে কেনাকাটার জন্যও আলাদা সময় বরাদ্দ দেয়া হয়।

অধিকাংশ চীনা ঈশ্বর বা ধর্ম বিশ্বাসী নয়। তবে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য কর্তৃপক্ষ শুক্রবারে বাসে করে মসজিদে নিয়ে গিয়ে নামাযের ব্যবস্থা করে। মানেন না। সময় মানার ক্ষেত্রে চীনারা একাট্টা। তাদের কাছে বন্ধুত্ব মানে বিশ্বাস-আস্থা। কর্মই তাদের কাছে ধর্ম। জীবন দিয়ে হলেও দায়িত্ব পালনে তারা ন্যায়নিষ্ঠ।

খাবারের জন্য নির্ধারিত ছিলো ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিন। চপস্টিক হাতে বিভিন্ন চীনা খাবার মেন্যু পরিবেশিত হয় শিক্ষার্থীদের জন্য। চীনারা গরম খাবার খেতে পছন্দ করে। তারা খাবারের সঙ্গে পানিও খায় না। এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হচ্ছে এতে পেটে গ্যাস হয় না এবং পাকস্থলি সহজেই খাবার হজম করতে পারে। সার্বক্ষণিক তাদের হাতে থাকে গ্রিন টি বা লুই চায়ের ফ্ল্যাক্স। আবার খাবারের সময়ও নির্ধারিত। নাস্তা সকাল আটটার মধ্যে, দুপুরের খাবার ১২টার মধ্যে এবং ডিনার সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে শেষ।

ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের খাবার গ্রহণ

চীন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শাহান কামাল উদয় বলেন, “চীন যেমন বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ, তাদের ভাষা সঙ্গীতও তেমনই বৈচিত্র্যময়। আমরা যেমন চীনের লোকজ ও জাতীয় সংগীত শুনেছি; তেমনই আমাদের রবীন্দ্র, নজরুল, হাছন, লালনও তারা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেছে।” ‘থিয়েটার অ্যান্ড পারফর্মেন্স স্টাডিজ’ বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তিথী চক্রবর্তী বলেন, “ইউনানের সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। চীনাদের সময়সচেতনতাও চোখে পড়ার মতো। যদিও স্থানীয় খাবারের সাথে মানিয়ে নিতে আমাদের সমস্যা হয়েছিলো, কিন্তু পুরো ভ্রমণটি অত্যন্ত স্মরণীয় ছিলো।”

ক্যাম্পের পুরো সময়জুড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দলের সাথে থাকা স্বেচ্ছাসেবক দলের অন্যতম সোফিয়া (ইয়ুনইয়ুন তান) বলেন, “ইয়ুথ ক্যাম্প আমার জীবনে অনেক বেশি ছাপ ফেলেছে। বাংলাদেশের বন্ধুরা প্রাণবন্ত, বন্ধুবৎসল, সহজ-সরল। তাদের সঙ্গে কাটানো দুই সপ্তাহের স্মৃতি আমাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফিরছে। তারা হাঁটতে-চলতে এমনকি গাড়িতে চলন্ত অবস্থায় গান গেয়ে ওঠে; যা আমাকে মুগ্ধ করেছে।”

‘বাংলাদেশ-চীন ইয়ুথ সামার ক্যাম্প-২০১৭’ আয়োজনের মুখ্য ভূমিকা পালনকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুশিয়াস ইনস্টিটিউটের পরিচালক ঝো মিংতং (শিক্ষার্থীদের কাছে মিন্ডি লাওশি নামে পরিচিত) ক্যাম্পের উদ্দেশ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বলেন, “ইয়ুথ সামার ক্যাম্প ২০১৭ অত্যন্ত সফল হয়েছে। চীন সরকারের মূল্যায়নও তেমন। বাংলাদেশের তরুণদের সঙ্গে এই সম্পর্ক দিন-দিন আরও গভীরতর হতে থাকবে। শুধু ঢাকা থেকে শিক্ষার্থীরা কুনমিং যাবে এমনটি নয়, সেখানকার শিক্ষার্থীদেরও ঢাকায় নিয়ে আসার চিন্তা রয়েছে। যদি সরকারি পর্যায়ে সহযোগিতা পাওয়া যায়, এই ধরণের আয়োজন আরও করা যেতে পারে। যেভাবে ঢাকায় কনফুশিয়াস ইনস্টিটিউট চীনা ভাষা শেখাতে কাজ করছে, একইভাবে ভবিষ্যতে ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়েও বাংলা ভাষা শেখানোর জন্য পৃথক বিভাগ চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।”

ক্যাম্পে বিভিন্ন কোর্স শেষে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের একটি লিখিত পরীক্ষা নেয়া হয় এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণদেরকে সনদপত্র প্রদান করা হয়।