sSiteTitle

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির ভুটান ও ভারত সফর

মোঃ মাহদী-আল-মুহতাসিম নিবিড়

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ০১:০০ পিএম, ৮ নভেম্বর ২০১৭ বুধবার | আপডেট: ০২:৪৪ পিএম, ১৫ নভেম্বর ২০১৭ বুধবার

ভুটানের পুনাচাংচু নদীর তীরে সাংবাদিক সমিতির আমরা ক`জন

ভুটানের পুনাচাংচু নদীর তীরে সাংবাদিক সমিতির আমরা ক`জন

গত মাসে ঘুরে এলাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ ভুটান এবং ভারত । আমাদের টিমের ১৭ সদস্যের সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সদস্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত নবীন সাংবাদিকদের সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির একজন সদস্য হিসেবে এক সপ্তাহব্যাপী এ ভ্রমণটি ছিল জীবনের এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।

সড়কপথে এই যাত্রায় বজ্র ড্রাগনের দেশ ভুটানের অপরূপ নগরী পারো-থিম্পু-পুনাখা যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে গত ২৪ অক্টোবর আমাদের সফর শুরু হয়। সড়কপথে ভুটান যেতে ভারতের ট্রানজিট ভিসার দরকার হয়। আমাদের ভিসা হয় ২৩ তারিখ। পরদিনই যাত্রা শুরু। আগেই বাসের টিকিট কাটা ছিল। তাই ভিসা না হলে যাত্রাই অনিশ্চিত হয়ে যেত।


যাবার আগে সন্ধ্যায় আমরা সমিতির প্রধান উপদেষ্টা শ্রদ্ধেয় উপাচার্য মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান স্যারের দেয়া দিক নির্দেশনামূলক পরামর্শগুলো ছিল অমুল্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসার্স বাসে করে স্যার আমাদের পাঠিয়ে দিলেন গাবতলীতে। রাতে শাহ আলী বাসে করে লালমনিরহাটের সীমান্তবর্তী বুড়িমারি স্থলবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ১০-১১ ঘণ্টা জার্নি শেষে সকাল আটটার দিকে বুড়িমারি সীমান্তে পৌছলাম। কাছেই ইমিগ্রেশন অফিস। প্রয়োজনীয় কাজ সেরে সাড়ে নয়টার দিকেই ঢুকে গেলাম ভারতের চেংরাবান্ধায়।


সেখান থেকে রিজার্ভ গাড়ি পাওয়া যায়। ২০০০ রুপির মতো খরচ পরল। দুটো টাটা সুমো গাড়ি রিজার্ভ করে ভারতের কুচবিহার, ড্যুয়ার্স আর জয়গাঁও এর চাবাগান দেখতে দেখতে ৩ ঘন্টা পর পৌছলাম জয়গাঁও। সেখানেই ভূটানের সীমান্ত। ভুটানের সীমান্তবর্তী এলাকার নাম ফুয়েন্টশেলিং।


জয়গাওতে ভূটান গেটের পাশে তৃপ্তি হোটেলে তৃপ্তি সহকারে খেয়ে চলে গেলাম ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশন অফিসে। সেখানে এক্সজিট সিল লাগিয়ে সন্ধানাগাদ সোজা চলে গেলাম ভুটান গেট। চমৎকার এই গেটটি দিয়ে ভুটানে প্রবেশ করতে হয়।ভূটান-ইন্ডিয়া ওপেনবর্ডার, যখন খুশি যাওয়া ও বের হওয়া যায়। কোন সমস্যা নেই।


সেখানে সীমান্তের কাজ শেষ করে ঢুকে গেলাম ভুটানের ফুয়েন্টশেলিং।মনে হলো যেন মর্ত্য থেকে স্বর্গে চলে এসেছি। পাশাপাশি দুটি দেশ অথচ কত পার্থক্য। জয়গাঁও অনেক অপরিচ্ছন্ন আর কোলাহলপূর্ণ, অন্যদিকে ফুয়েন্টশেলিং পুরোটাই গোছানো, পরিচ্ছন্ন আর একদম নিরিবিলি। যাওয়ার আগে শুনতাম ছবির মতো সুন্দর একটা দেশ, কিন্তু যাওয়ার পর বুঝলাম তার থেকেও সুন্দর গোছানো বজ্র ড্রাগনের দেশ ভূটান।


আমরা ভূটান গেট দিয়ে ফুএন্টশলিং পৌঁছাই সন্ধ্যা ৬টায় এবং সেখান থেকে ২টা ৮সিটের গাড়ি ভাড়া করে রওনা দেই অপূর্ব নগরী পারোর উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে প্রায় রাত ১১:০০।বাংলাদেশ এবং ভুটানের সময় একদম এক (GMT+6)।


আমরা সরাসরি পারোতে গিয়ে ড্রাগন হোটেলে গিয়ে উঠলাম। মাঝে রাস্তার পাশে এক চমৎকার রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। ভাত, ডাল আর ভূটানের এক চমৎকার সবজি। ঠাণ্ডায় হাত-পা জমে যাচ্ছিল। রুমে গিয়ে গরম পানিতে গোসল সেরে ঘুম, ভোর হতেই উঠে পরতে হবে যে। এ হোটেলে প্রায় সবধরনের বাঙালি খাবার যেমন সাদাভাত, আলুভর্তা, আলুভাজি, মুরগির তরকারি, সবজি সবই পেলাম তবে দাম একটু বেশি।


পারো হচ্ছে ভুটানের সব থেকে সুন্দর শহর।এই শহরেই ওদের একমাত্র আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট।আমাদের হোটেলের পাশেই বয়ে চলেছে এক নদী, যার সবুজাভ নীল রঙের পানির কল কল ধ্বনি বিমোহিত করে দেয়।


আমাদের প্রথম টার্গেটই ছিল পারোর সব থেকে বড় আকর্ষণ টাইগার্স নেস্ট বা টাকসিন।তিন কিলোমিটারেরও বেশি উঁচু এ পাহাড়ের উপুরে কয়েকটি বৌদ্ধ মন্দির।এটা ওদের ধর্মীয় এবং পর্যটনের দিক থেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ । খাড়া পাহাড় বেয়ে দশহাজার ফুট হেটে উঠতে হবে, উপরের দিকে অক্সিজেনের স্বল্পতায় জান বের হয়ে যাবার জোগাড়। পাহাড়ের চুড়াতে উঠে যখন নিচের দিকে তাকালাম তখন মনে হল আসলেই কিছু জয় করে ফেলেছি। টাইগ্রেস নেস্টের ভেতরের প্যাগোডাতগুলো আসলেই রহস্যে ঘেরা। এরপর আবার নেমে আসতে হবে।পায়ে হাটার বিকল্প কোন ব্যবস্থা নাই। আমাদের উঠতে সময় লেগেছিল প্রায় ৩:০০ঘণ্টার মত ,আবার নামতে সময় লেগেছে প্রায় ২ ঘণ্টা। দিনশেষে এটাই ছিল সব থেকে মজার এবং সারা জীবন মনে রাখার মতন একটা ঘটনা। ভুটানে সমতলের রাস্তা একেবারে নেই বললেই চলে। পুরো দেশটির যেকোন জায়গায় যেতে পাহাড়ের গা বেঁয়ে সরু রাস্তার উপর দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। প্রথম দিকে একটু আধটু ভয় পরে অবশ্য উপভোগ্য হয়ে ওঠে।

ভুটানের পারো নগরীর এক রাস্তার পাশে আমরা নবীন সাংবাদিকেরা

 

পারোতে দুইদিন থেকে আমাদের গন্তব্য ভুটানের রাজধানী থিম্পু। চমৎকার রৌদ্রজ্জ্বল আবহাওয়া আর সাথে সহনীয় ঠান্ডায় থিম্পু শহরটা চক্কর দিতে দিতে এগিয়ে চললাম, গন্তব্য কিংস ম্যামোরিয়াল চর্টেন। ভুটানের তৃতীয় রাজা জিগমে দরজি ওয়াঙ্গচুকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ১৯৭৪ সালে এটি তৈরি করা হয়েছিল। সেখান থেকে গেলাম থিম্পুর লোকশিল্প জাদুঘরে। ছাত্রদের জন্য হাফ টিকেট। আমরাও সে সুবিধাতা পেলাম।


সেখান থেকে আমাদের গন্তব্য বুদ্ধাপয়েন্ট। পাহাড়ের অনেক উঁচুতে অবস্থিত সোনালী রঙের বিশালাকার এক বুদ্ধমূর্তি। সেখান থেকে প্রায় পুরো থিম্পু শহরটা দেখা যায়। সুউচ্ছপাহাড়গুলো অতন্দ্রপ্রহরীর মত চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে পুরো শহরটাকে। বুদ্ধাপয়েন্ট ঐ সময় চলছিল পূজা অর্চনা। অসম্ভব সুন্দর জায়গাটি, দেখলেই মন ভরে যায়।


পুনাখা ভুটানের এক অসাধারণ পর্যটন এলাকা। তাই একদিন সময় রাখলাম পুনাখা ঘুরতে।পুনাখায় পুনাচাংচু নদী, দুচালা, অনন্য সুন্দর অট্টালিকা পুনাখা জং এবং সাস্পেনশন ব্রিজ দেখে সেখানে নেমে ছবি না তুলে যাওয়া যায় না। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় সময়টা ছিল দারুন উপভোগ্য। যাওয়ার পথে দেখলাম বড় এক মাঠে অনেক স্কুলের ছাত্রছাত্রী। বইমেলা হচ্ছে সেখানে। গাড়ী থামিয়ে আমরাও নেমে পড়লাম। ভুটানের ইতিহাস-সংস্কৃতি ছাড়াও নানা বিদেশী বইয়ের সমাহার। তবে ভুটানের প্রকাশনা শিল্প খুব উন্নত না হওয়ায় তাদের অধিকাংশ বই আসে ভারত থেকে। তাদের তো আর নীলক্ষেত আর বাংলাবাজার নেই।


সারাদিন ঘুরে রাতে আবার থিম্পুতে ফিরে গেলাম হোটেল উডসে। ভুটানের রাস্তাগুলো সমতল থেকে কয়েক হাজার ফুট উপরে। একবার পান থেকে চুন খসলে নিশ্চিত মৃত্যু। কারণ রাস্তা থেকে একবার নিচে পড়লে কয়েক হাজার ফুট নিচে গিয়ে পড়তে হবে। এজন্য নিরাপদ গাড়ি চালনা খব জরুরী।


সপ্তাহব্যাপী এ ভ্রমণটি আমার জীবনের এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।যাওয়ার আগে শুনতাম ছবির মতো সুন্দর একটা দেশ কিন্তু যাওয়ার পর দেখলাম তার থেকেও সুন্দর গোছানো বজ্র ড্রাগনের দেশ ভূটান।


ভুটানের সব সুন্দর অভিজ্ঞতা নেয়ার পর আমাদের পরের গন্তব্য ছিল আরেক সৌন্দর্যের রানি দার্জিলিং। চাবাগানে ঘেরা অপুরুপ সুন্দর দার্জিলিং শুধু টিভিতেই দেখেছি কিন্তু এবার সুযোগ এসেছে সামনে থেকে দেখার। থিম্পু থেকে ফুএেন্টসলিং হয়ে জয়গাতে নেমে খাওয়া দাওয়া আর ইমিগ্রেশনের কাজ শেষে এবার রওনা হলাম দার্জিলিং এর উদ্দেশ্যে। ভালো কথা ভূটান বর্ডারগেটে এক্সিটসিল আর ইন্ডিয়ার জয়গাতে ওদের ইমিগ্রেশন অফিসে এন্ট্রিসিল নিতে হয়। রাতে হোটেলে পৌঁছে দুই-তিন ঘন্টা ঘুমিয়েই ডাক পরল তৈরি হওয়ার জন্য; উদ্দেশ্য দার্জিলিং-এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান টাইগার হিল। এর পাহাড়ের ছুড়ায় দাঁড়িয়ে সূর্যদয় দেখতে পারাটা অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা। এর সাথে সূর্যের আলো গিয়ে আচড়ে পরে নেপালের কাঞ্ছনজঙ্ঘা পাহাড়ে।

এরপর চা বাগান, চিড়িয়াখানা, ঐতিহ্যবাহী সেন্ট জোসেফ স্কুল ঘুরে রওনা দিলাম শিলিগুড়ি। অনেক বড় শহর। সেখানেই একটু কেনাকাটা করলাম। সেখানে একরাত থেকে পরের দিন দুপুরে প্রিয় মাতৃভুমি বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা শুরু হল। জীবনের প্রথম বিদেশ ভ্রমনের এ বিচিত্র অভিজ্ঞতাতাটি কখনো যেন ভোলার নয়।