Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

ঢাবির প্রাচীন বৃক্ষরাজিঃ শত ইতিহাসের নীরব সাক্ষী

কাজী সুলতান মোঃ আবু সায়েম

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ১০:০১ পিএম, ৭ নভেম্বর ২০১৭ মঙ্গলবার | আপডেট: ১১:১৬ এএম, ৮ নভেম্বর ২০১৭ বুধবার

আইন অনুষদের সামনে অবস্থিত রেইনট্রি গাছ

আইন অনুষদের সামনে অবস্থিত রেইনট্রি গাছ

১৯২১ সালে প্রায় ২৭৫ একর জমির উপর গড়ে উঠে বাংলাদেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’। রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রে অবস্থিত হয়েও ঢাবি ক্যাম্পাসে যে পরিমাণ গাছপালা আছে তা সত্যিই বিস্ময়কর। এসব গাছপালার কিছু অংশ সাম্প্রতিক সময়ে লাগানো হলেও, কিছু কিছু গাছ লাগানো হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে, কিংবা প্রতিষ্ঠার কয়েক দশকের মধ্যে; এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে থেকে লাগানো বৃক্ষও এখনো ঢাবির মাটিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে বলে অনেকের অভিমত রয়েছে। এ লেখাটি শুধুমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে অনন্য মাত্রা যোগ করা এসব পুরনো বৃক্ষ সম্পর্কে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিংবা শখ করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘুরতে আসা অতিথিরা দেশের প্রথম এবং সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরূপ সৌন্দর্য দেখে যেমন মুগ্ধ হন তেমনি তাদের নজর এড়ায় না ঢাবি ক্যাম্পাসের নানা স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় শতবর্ষ স্পর্শী বৃক্ষরাজি।  পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস জুড়ে এমন প্রাচীন বৃক্ষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। তবে উল্লেখ করার মত বিষয় হলো প্রাচীন এই বৃক্ষগুলো কেবল একস্থানে অবস্থিত নয়; বরং ছড়িয়ে আছে ক্যাম্পাসের নানান জায়গায়।  বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল, শহীদ মিনার, মোতাহের হোসেন ভবন, কলা ভবন, ফুলার রোডসহ প্রায় সবখানেই দেখা মেলে এসব প্রাচীন বৃক্ষের। পুরো ক্যাম্পাসে পঞ্চাশ পেরুনো এমন বৃক্ষের সংখ্যা প্রায় চল্লিশটিরও অধিক। বয়সের বিচারে এর কোন কোনটির বয়স পঞ্চাশ, কোন কোনটির ষাট, আবার কোন কোনটির বয়স সত্তর কিংবা আশিরও বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের তথ্য অনুসারে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল এলাকায় অবস্থিত সবচেয়ে প্রচীন বৃক্ষটির নাম মেহগনি,  বয়স ৮১ বছর। এছারা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে জগন্নাথ হলের পথ ধরে একটু এগোলেই উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের মূল ফটকের একেবারে সামনেই বিশালাকৃতির একটি তেঁতুলগাছ চোখে পড়ে । অন্য পথে উপাচার্যের বাসভবন থেকে ব্রিটিশ কাউন্সিল হয়ে আরেকটু সামনে এগোলেই দেখা যায় গাছটি। অনেকের মতে, এই তেঁতুল গাছটির বয়স ১০০ বছরেরও বেশি। তেঁতুল গাছটির দিকে একটু দৃষ্টি দিলেই দেখা যায়, এর কালো রঙের কাণ্ড অসংখ্য গুটিভর্তি। সারা দেহ বিভিন্ন দাগে ক্ষতবিক্ষত। এছাড়া কাটা পড়েছে অনেক ডালপালা। তবে একদম ওপরের দিকের কয়েকটি ডালপালা এখনো বেশ সজীব। শতবর্ষী এই তেঁতুল গাছের এমন রূপ যেন আমাদের ইতিহাসেরই রূপক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে প্রাচীন বৃক্ষের কথা বললেই উঠে আসে এই দুটো বৃক্ষের নাম। কেননা সঠিক বয়স নিয়ে যতই দ্বিধা থাকুক না কেন এই মেহগনি এবং তেঁতুল গাছের বয়স যে আশি ছাড়িয়ে গেছে এতে কোন সন্দেহ নেই। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে উল্লেখ করার মত আরো কয়েকটি প্রাচীন বৃক্ষ। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় ফার্মেসী অনুষদের অন্তর্ভূক্ত ভেষজ বাগানের কথা। এখানে রয়েছে প্রায় বিশটির মতো প্রাচীন বৃক্ষ। ভেষজ বাগানের প্রসঙ্গে বলা বাহুল্য, ঢাবির কার্জন হলে যে উদ্ভিদ বিজ্ঞান উদ্যান এবং ভেষজ বিজ্ঞান উদ্যান রয়েছে সেখানে গেলে আশেপাশের বহু প্রাচীন বৃক্ষের পাশাপাশি দেখা মিলবে কালোমেঘ, সবুজ গোলাপ এবং মহাভূঙ্গরাজের মতো দুষ্প্রাপ্য উদ্ভিদের।


শহীদ মিনারের বিপরীত দিকের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় চোখে পড়ে প্রায় চল্লিশ পেরুনো দুটি রেইন ট্রি।  ঢাবির আইন অনুষদের সামনেই এই দুটি বৃক্ষের অবস্থান। এছাড়া শহীদ মিনার ও জগন্নাথ হলের রাস্তা দিয়ে ফুলার রোডের দিকে হাঁটার সময় ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল এন্ড কলেজের ঠিক মূল ফটকের সামনেই দেখা মিলবে একটি প্রাচীন বটবৃক্ষের। প্রতিবেদনের জন্য তথ্য সংগ্রহকালে সেখানে অবস্থানরত কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এই বটবৃক্ষের বয়স ষাটের কম নয়। এছাড়া কলা ভবনের সামনেও রয়েছে এরকম আরো কিছু ষাট কিংবা সত্তর বছর পেরুনো বৃক্ষ।

প্রায় শতবর্ষী প্রাচীন এসব বৃক্ষ সাক্ষী হয়ে আছে দেশ বিভাগ, ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ এর ছয় দফা, ৬৯ এর গণ অভ্যূথান, ৭০ এর সাধারণ নির্বাচন এবং ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে সংঘটিত হওয়া অসংখ্য আন্দোলনের নিরব সাক্ষী হয়ে এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এসব বৃক্ষরাজি। কালের সাক্ষী এসব প্রাচীন বৃক্ষ এক জীবনে অনেক কিছু দেখেছে। মোকাবেলা করেছে অনেক বৈরী পরিস্থিতির।