Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

প্রাণের উচ্ছ্বাসে মুখরিত ক্যাম্পাস রজনী

গিয়াস উদ্দিন

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ১১:৪৩ পিএম, ৭ নভেম্বর ২০১৭ মঙ্গলবার | আপডেট: ০৯:২৩ এএম, ৮ নভেম্বর ২০১৭ বুধবার

চিত্রঃ নিয়ন বাতির আলোয় সদা জাগ্রত রাজু ভাস্কর্য

চিত্রঃ নিয়ন বাতির আলোয় সদা জাগ্রত রাজু ভাস্কর্য

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সর্বদাই মুখরিত থাকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পদচারণায়। দেশের সর্বোচ্চ এই বিদ্যাপীঠ যেন প্রাণের উল্লাসে বয়ে চলা চির যৌবনা খরস্রোতা এক নদী, যে নদী  বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের  সাক্ষী হয়ে  যুগের পর যুগ ক্লান্তিহীনভাবে ছুটে চলছে আপন গতিতে। এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যেমন রয়েছে বর্ণিল ইতিহাস, তেমনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের  ক্যাম্পাসেরও রয়েছে বিচিত্র রূপ; যা পাল্টে যায় ক্ষণে ক্ষণে সময়ের আবর্তনে।

দিনের সকল কর্মব্যস্ততাকে ছুটি দিতে নিঃশব্দে আগমন হয় রাতের। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস জেগে উঠে নতুন সাজে, নতুন রূপে। শুরু হয় নতুন ব্যস্ততা। শুরু হয় ভিন্ন ধরনের ছুটে চলা। জ্বলে উঠে  নিয়ন বাতির আলো। যে আলো চোখ ঝলসে না দিয়ে বৃক্ষের শাখা-পল্লবের সাথে মেতে উঠে আলো-আঁধারি খেলায়।

দিনের বেলা শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত থাকে ক্লাস আর পড়াশোনা নিয়ে। কিন্তু সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন চত্বরে তারা হাজির হয়ে মেতে উঠে আড্ডা, গল্প-গানে। রাতের আঁধারকে হার মানিয়ে নতুন কর্মব্যস্ততায় জেগে উঠে ক্যাম্পাস, হয়ে উঠে প্রাণচঞ্চল।

 

চিত্র: রাতের আড্ডায় মুখরিত সবুজ চত্বর

ছাত্র-শিক্ষক ছাড়াও নানা বয়স, নানা পেশার মানুষের সমাগম হয় এই ক্যাম্পাসে। তাদের আগমনের কারণ ও উদ্দেশ্যও ভিন্ন ভিন্ন। সাবেক শিক্ষার্থী বা কর্মীরা ছুটে আসেন তাদের স্মৃতিকে ফিরে পাওয়ার আশায় বা পরিচিত কোনো মুখের খোঁজে। আবার কেউ  আসেন নিছক আড্ডা-গল্পে সময় পার করার জন্য।

সন্ধ্যায় মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয় ঢাবির বিভিন্ন চত্বর, প্রাঙ্গন ও মোড়। হাকিম চত্বরের কড়ই গাছ তলা, রাজনীতির আতুর ঘর হিসেবে পরিচিত মধুর ক্যান্টিন, ডাকসু ক্যাফেটেরিয়া, কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার প্রাঙ্গণ, ত্রিমোহনার কেন্দ্রস্থল ভিসি চত্বর, মুক্তিযোদ্ধার আবক্ষ মূর্তি অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ বা প্রাণবন্ত টিএসসির মোড় সরগরম হয় নানা জনের পদচারণায়।

রাতের আড্ডার প্রধান কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিত টিএসসি, হাকিম চত্বরের পাশাপাশি মালরো বাগানের পাশে খালি জায়গা (অনেকে মজা করে বিড়ি চত্বরও বলে থাকে ) এবং জিয়া হল, জসিম উদদীন হল, বঙ্গবন্ধু হল, সূর্যসেন হল ও বিজয় একাত্তর হলের মধ্যবর্তী রাস্তাটিও  বেশ জমে উঠে রাতের আড্ডায়। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট আর গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে শুরু হয় জীবনের গল্প। এ গল্প  স্মৃতি রোমন্থনের, সফলতা-ব্যর্থতা্র, পাওয়া আর না পাওয়ার। আবার ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে চলে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক ।

নানা ব্যস্ততায় অনেকে দিনে খেলাধুলার সময় পায়না। তারা বেড়িয়ে পড়ে রাতের বেলা ক্রিকেট বা ব্যাডমিন্টন খেলার জন্য। স্বল্প আলোতেই চলতে থাকে ক্রীড়া উৎসব।

 

চিত্র: শিক্ষার্থীদের মধুর স্মৃতি রাতের ক্রিকেট খেলা

নানা ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও চলে রাতের ক্যাম্পাসে। মধ্যরাতের নিরবতাকে ভেদ করে  মাঝে মধ্যেই ধ্বনিত হয় বিভিন্ন রাজনৈতিক স্লোগান। প্রথম বর্ষের গণরুমের বাসিন্দারাই সাধারণত স্লোগানগুলো দিয়ে থাকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ হলে নেই সঙ্গীত চর্চার সুযোগ। তাই সঙ্গীত চর্চার জন্য গভীর রাতে গিটার আর হারমোনিয়াম নিয়ে ক্যাম্পাসে বের হয় সঙ্গীত প্রেমিরা। তাদের গানের সুর আলো-আঁধারি এ পরিবেশকে করে তোলে আরো মনোরম, আরো মোহনীয়। দূর করে দেয় সকল একাকিত্ব। সুরের এ ভেলা চলতে থাকে রাতের শেষ প্রহর অবধি।

ক্যাম্পাসে লোকজনের সমাগম  শুধু আড্ডা আর বিনোদনের জন্যই হয় না। অনেকে আসে জীবন ও জীবিকার তাগিদে। ঢাকা শহরের কিছু অসহায় মানুষের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন হয়ে হাজির হয় রাতের ক্যাম্পাস। রাতের ক্যাম্পাসে চা, পান, বিড়ি, সিগারেট, বিভিন্ন ভর্তা আর পিঠা বিক্রি করে চলে তাদের সংসার। ছিন্নমূলদের অনেকে আসে ফুল ও মালা বিক্রি করতে এবং ক্যাম্পাস থেকে ফুল সংগ্রহ করার জন্য। সেই ফুলের মালা হাতে নিয়ে পরের দিন সন্ধ্যায় বের হয় দু-মুঠো খাবার কেনার পয়সা সংগ্রহের জন্য। অনেকে রাতের ঘুমকে উপেক্ষা করে বের হয় রিক্সা নিয়ে দু’পয়সা বেশি উপার্জনের আশায়।

চিত্র: ছিন্নমূল শিশুদের রাত্রিযাপন

ছিন্নমূল শিশুরা রাত হলেই ছুটে আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। দিনের বেলা কুড়িয়ে পাওয়া খাবার নিয়ে আয়োজন করে চড়ুইভাতির। ক্ষণিকের জন্য ভুলে যায় তাদের অনাহারে, অনাদরে, অবহেলার মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা জীবনের কথা।

ক্যাম্পাস পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য পরিচ্ছন্ন কর্মীরা সাধারণত কাজ করে রাতের বেলায়। বিশেষ করে মধ্যরাতের পর। আর ক্যাম্পাসে নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাতভর ছুটে চলে ঢাবি প্রশাসনের গাড়ি।

যাদের মাথা গোজার কোনো ঠাই নেই তাদের অনেকে রাতের বেলা চলে আসে ক্যাম্পাসে একটু আশ্রয়ের খোঁজে।  কোনো গাছের নিচে বিছানা পেতে ঘুমিয়ে পড়ে নিশ্চিন্তে । রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে মানুষের আনাগোনা কমলেও সুনসান নিরবতা নেমে আসেনা কখনই। জেগে থাকে নির্ঘুম সারারাত।