Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

বাংলাদেশের দ্বিতীয় পার্লামেন্ট : মধুর ক্যান্টিন

জাকিয়া জাহান মুক্তা

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ১০:৪৩ পিএম, ৭ নভেম্বর ২০১৭ মঙ্গলবার | আপডেট: ১০:১১ এএম, ৮ নভেম্বর ২০১৭ বুধবার

চিত্র: ঐতিহাসিক মধুর ক্যান্টিনের প্রবেশদ্বার

চিত্র: ঐতিহাসিক মধুর ক্যান্টিনের প্রবেশদ্বার

মধুর ক্যান্টিনের চায়ের কাপে তৃপ্তির চুমুক আর উত্তপ্ত রাজনৈতিক আলাপচারিতার মুখরতা শুধু এখনকার বাস্তবতা নয়, এই গতিময়তা চলে আসছে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মেরও বহু আগে থেকে। আজ যে আমরা বাঙ্গালী, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের নাগরিক তার পেছনেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে এই মধুর রেস্তোরার। তবে বর্তমানে এটি ‘মধুর ক্যান্টিন’ নামেই বেশি পরিচিত। এই ক্যান্টিনের সাথে যার নাম জড়িত তিনি আমাদের সকলের প্রিয় মধুসূদন দে। মধুদা নামেই তিনি সমধিক পরিচিত।

প্রচলিত আছে মধুর ক্যান্টিনে না এলে ভালো রাজনীতিবিদ হওয়া যায় না। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী  সকল আন্দোলনের গতি প্রকৃতি ও নীতি নির্ধারণের কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক এই ক্যান্টিনটি। মধুর ক্যান্টিন, নামে ক্যান্টিন হলেও এটি সকল সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, ছাত্র সংগঠন ও সাংবাদিকদের অস্থায়ী  কার্যালয়। এদেশের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদদের অনেকেরই রাজনীতির হাতেখড়ি এই ক্যান্টিনে।

অনেক হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ এবং আন্দোলনের নীরব সাক্ষী এই মধুর ক্যান্টিন। মধুর ক্যান্টিনের চেয়ার-টেবিল, চায়ের কাপ সকলকিছুতেই রয়েছে ইতিহাসের স্পর্শ।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে এর অবিচ্ছেদ্য-নিবিড় সম্পর্ক। শুরুতে কিন্তু এর নাম মধুর ক্যান্টিন ছিল না। আগে এটি মধুর স্টল, মধুর টি-স্টল, মধুর রেস্তোরা ইত্যাদি নামেও পরিচিত ছিল। ১৩৭৯ বঙ্গাব্দের ২০ বৈশাখ ডাকসুর উদ্যোগে এই ক্যান্টিনের নামকরণ করা হয়।

জনশ্রুতি রয়েছে বর্তমান মধুর ক্যান্টিন ভবনটি ছিল শ্রীনগরের জমিদারের বাগানবাড়ির নাচঘর। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এই বাগানবাড়ির নাচঘরেই ক্যান্টিনটি স্থাপিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের পাশে অবস্থিত এই মধুর ক্যান্টিন শুধু রাজনীতিই নয়; জ্ঞানচর্চা, সঙ্গীতচর্চা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, বিভিন্ন সংগঠনের মিটিং এ সবকিছুরই প্রাণকেন্দ্র।

’৪৮- এ ভাষা আন্দোলন এর সূচনা, ’৪৯- এ বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলন, ’৫২ এর চ’ড়ান্ত ভাষা আন্দোলনের অলিখিত হেড কোয়ার্টার। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক আন্দোলনের বীজ বপনের জমিন ছিল এই ক্যান্টিন। অনেকের মতে আবার মধুর ক্যান্টিন বাংলাদেশের দ্বিতীয় পার্লামেন্ট।

চিত্র: ক্যান্টিনের বর্তমান চিত্র, চলছে রাজনৈতিক সভা

উনিশ শতকের  প্রথম দিকে বিক্রমপুরের শ্রীনগরের জমিদারদের সঙ্গে মধুদার পিতামহ নকরীচন্দ্রের ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে উঠে। ব্যবসা প্রসারের উদ্দেশ্যে নকরী চন্দ্র তার দুই ছেলে আদিত্য চন্দ্র ও নিবারণ চন্দ্র সহ ঢাকায় আসেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর নকরী চন্দ্র পুত্র আদিত্য চন্দ্রের উপর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের মাধ্যমে তার ব্যবসা শুরু করেন। ব্রিটিশ পুলিশ এসময় ক্যাম্পাসের আশে-পাশের ব্যারাক ও ক্যাম্প প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিলে আদিত্য চন্দ্র পুলিশের কাছ থেকে ৩০ টাকার বিনিময়ে দুটি ছনের ঘর কিনে তার একটিতে ব্যবসা শুরু করেন। মধুসূদন দে (মধুদা) -র বয়স তখন ১৫ বছর। পিতার মৃত্যুর পর মধুদা পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরেন।

১৯৭১ সালে মধুর ক্যান্টিন পাক বাহিনীর রোষানলে পড়ে। এরই সূত্র ধরে ’৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে নির্মম ভাবে শহীদ হন সবার প্রিয় মধুদা, তার স্ত্রী, বড় ছেলে ও তার নববিবাহিত স্ত্রী।

মধুদার স্মরণে মধুর ক্যান্টিন প্রাঙ্গনেই নির্মিত হয়েছে শহীদ মধুদার স্মৃতি ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটির গায়ে  লেখা রয়েছে ‘আমাদের প্রিয় মধুদা’ বাক্যটি। এর ভাস্কর মোঃ তৌফিক হোসেন খান। ১৯৯৫ সালের ১৮ এপ্রিল তৎকালীন উপাচার্য এমাজ উদ্দীন আহমেদ ভাস্কর্যটি উদ্বোধন করেন। তবে পরবর্তীতে এর পুনঃনির্মাণ  হয় এবং ২০০১ সালের ১৭ মার্চ পুনঃনির্মিত ভাস্কর্যের উদ্বোধন করেন উপাচার্য এ. কে আজাদ চৌধুরী।

চিত্র: মধুদা স্মৃতি ভাষ্কর্য

তবে ইতিহাসের সাক্ষ্য বহনকারী  ঝলমলে, প্রাণোচ্ছল এই ক্যান্টিনের বর্তমান অবস্থা কিছুটা নাজুক। ক্যান্টিনটি আজ তার জৌলুস হারাচ্ছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেকেই এর ইতিহাস, ঐতিহ্য, তাৎপর্য সম্পর্কে খুব বেশি কিছু  জানেনা। মধুর ক্যান্টিনের আশে-পাশের পরিবেশগত বিপর্যস্ততাও সহজেই চোখে পড়ে। নজর এড়ায়না অবজ্ঞায় আর অবহেলায় পড়ে থাকা মধুদার ভাস্কর্যও। খাবারের গুণগত মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে অনেক শিক্ষার্থীর। এতদসত্ত্বেও মধুর ক্যান্টিন নাম নিলেই একটা মধুময় অনুভ’তি পরিলক্ষিত হয় আনেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে। একবাক্যে সকলেই মধুর ক্যান্টিনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবিচ্ছেদ্য অস্তিত্ব বলে মনে করেন। ঐতিহ্যবাহী এই ক্যান্টিন স্বমহিমায় ভাস্বর আজও । সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবী - মধুর ক্যান্টিনের বর্তমান জরা-জীর্ণ অবস্থার বিপরীতে একটি প্রাণোচ্ছল, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিতকরণ ও খাবারের গুণগত মান বৃদ্ধিতে যেন যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।