sSiteTitle

মুক্তিযুদ্ধ, ঢাবি এবং স্মৃতি চিরন্তন

জিনাত শারমিন

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ০৯:৫৬ পিএম, ৭ নভেম্বর ২০১৭ মঙ্গলবার | আপডেট: ০৮:৩১ এএম, ৮ নভেম্বর ২০১৭ বুধবার

টেরাকোটায় বাংলাদেশের ইতিহাসের খণ্ডচিত্র

টেরাকোটায় বাংলাদেশের ইতিহাসের খণ্ডচিত্র

“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ”  শুধু একটা নাম নয়, একটা প্রতিষ্ঠান নয়, `৫২, `৬৯, `৭১ থেকে শুরু করে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী শাসনের পতন তথা দেশের সমস্ত রাজনৈতিক আর সংস্কৃতিক পট পরিবর্তনের শুরুটা ঘটেছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর নেতৃত্বে, এই বিশ্ববিদ্যালয় তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেড়িয়ে হয়ে ওঠে বাংলাদেশের অস্তিত্বের আঁতুরঘর, চেতনার এক মূর্ত প্রতীক।

বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রধান ফটক "মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ" দিয়ে প্রবেশ করে কিছুদূর সামনে এগোলে ভিসির বাসভবনের সামনে চোখে পড়বে ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে আত্মত্যাগ-তারই নিদর্শনস্বরূপ গ্রানাইট পাথরের ছোট বড় ১৪ টি দেয়াল। বেদিতে ওঠার সময় কালো সিঁড়ির উভয় পাশে বাংলা ও ইংরেজীতে মুক্তিযুদ্ধের সময় নিহত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর শহীদ সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে "স্মৃতি চিরন্তন" শিরোনামে নাম ফলক।

"মরণসাগর পারে তোমরা অমর, তোমাদের স্মরি, নিখিলে রচিয়ে গেলে আপনারি ঘর, তোমাদের স্মরি।" স্মৃতি চিরন্তনে পা রাখতেই চোখে পড়বে সমান দূরত্বে অবস্থিত সম আকৃতির দু`টি স্তম্ভ, যার একটিতে রয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই অমর চরণদ্বয়। অপর স্তম্ভে রয়েছে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম থেকে উদ্ধৃত : "শহীদ ভাইদের মুখ মনে কর, আর গভীর বেদনায় মূক স্তব্ধ হইয়া যাও, মনে কর, তোমাকে মুক্তি দিতেই সে এমন করিয়া বিদায় লইয়াছে।"

                                                            চিত্র: শতবর্ষী কড়ই এর ছায়ায় স্মৃতি চিরন্তন

ইতিহাসের নীরব সাক্ষী, প্রায় দেড়শ বছরের বিশাল এক রেইনট্রি (কড়ই) গাছ মায়ের মমতায় ডাল পালা মেলে ছায়া দিয়ে বুকে করে আগলে রেখেছে স্মৃতি চিরন্তনকে। রক্ত দিয়ে কেনা বাংলার প্রাণ বলিদানের ইতিহাসের অনেকগুলো পাতা জুড়ে রয়েছে ২৫ মার্চ কালো রাতের কাপুরুষোচিত অতর্কিত আক্রমন ও পুরো মুক্তিযুদ্ধ জুড়ে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের নৃশংস লাশ এ পরিণত হবার স্মৃতি। দীর্ঘদিন ধরে সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য দিচ্ছে স্মৃতি চিরন্তন বা মেমোরি ইটারনাল।

স্মৃতিফলকটি নির্মাণ করা হয় ১৯৯৫ সালে, আনুষ্ঠানিক উদ্ধোধন করা হয় একই বছরের ২৬ মার্চ, স্বাধীনতা দিবসে। স্থপতি মহিউদ্দীন শাকের, শিল্পী রফিকুন্নবী অনুমোদিত আবু সাঈদের ড্রইং এ কংক্রিটের দেয়ালে বসানো পোড়ামাটির ফলকে উঠে এসেছে পাক বাহিনীর নিষ্ঠুর, অমানবিক নর্যাতনের ইতিহাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদদের নামের তালিকা খোদাইকৃত জায়গাটি তাই পরিচিতি পায় শহীদ বুদ্ধিজীবী চত্ত্বর নামে।

 চিত্র: ১৯৯৫ সালের নির্মানাধীন স্মৃতি চিরন্তন, ডাকসু সংগ্রহশালা থেকে সংগৃহীত

দীর্ঘদিনের অযত্ন অবহেলায় স্মৃতির ফলক ক্রমশ বিস্মৃত হতে হতে ম্লান হয়ে যায় টেরাকোটা, দেয়াল থেকে খসে পড়ে প্ললেস্তরা। ঘাস বড় হয়ে জঙ্গলে রূপ নেয়। সব মিলিয়ে জীর্ণদশায় পরিণত হওয়া এই স্মৃতিফলককে নির্মাণের সময় মূল কাজের সীমাবদ্ধতাকে মাথায় রেখে ৩ মাস ধরে সংস্কার করে কর্তৃপক্ষ। পুরো সংস্কার কাজের তত্ত্বাবধানে ছিলেন চারুকলা অনুষদের ডিন, শিল্পী নিসার হোসেন। ফলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের চমৎকার পরিকল্পনায় নতুন রূপে আরো সমৃদ্ধ ও দৃষ্টিনন্দন হয়ে দেখা দেয় এই মনুমেন্ট।

 চিত্র:পোড়ামাটির ফলকে চিত্রিত পাকিস্তানিদের নির্মম হত্যাযজ্ঞ

মৃৎশিল্পী বিভাগের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের হাতে টেরাকোটার ফ্রেমে ধারাবাহিকভাবে ধরা দেয় বাংলাদেশের ইতিহাসের খণ্ড খণ্ড দৃশ্যপট। আর তাই ২০১৫ সালের ১৭ জুন টিনের বেড়ার আড়াল সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেবার দিন থেকে প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু করে কৌতুলহী সাধারণ মানুষ, পথচারী আর দর্শনার্থীর ভিড় লেগেই আছে।

শোকে মূহ্যমান কালো কঠিন গ্রানাইটের ওপর জ্বলজ্বল করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর সাথে সংশ্লিষ্ট ১৯৫ জন শহীদের নাম, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর শহীদ শিক্ষকবৃন্দ (১৮ জন), শিক্ষক পরিবারের শহীদ সদস্যবৃন্দ (০৬ জন), কর্মকর্তা পরিবারের শহীদ সদস্য (০১ জন), অনাবাসিক ছাত্রবৃন্দ (২০ জন), আবাসিক ছাত্রবৃন্দ (৭৬ জন), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশকৃত ছাত্র (০৯ জন), কর্মচারী (৩৩ জন), কর্মচারী পরিবারের শহীদ সদস্যবৃন্দ (২০ জন), প্রাক্তন কর্মচারী পরিবারের শহীদ সদস্যবৃন্দ (১৭ জন), মধুর ক্যান্টিনের শহীদ ব্যবস্থাপক ০১ জন, মধুসূদন দে) ও তাঁর পরিবারের শহীদ সদস্যবৃন্দ (০৩ জন)। 

চিত্র:শিশুর চোখ ইতিহাসের পাতায় খুঁজে ফিরছে নিজেকে

স্মৃতি চিরন্তনের এই ৮ টি গ্রানাইট ফলকের ভেতরের অংশে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও বাইরের অংশে পোড়া মাটির ফলকে রয়েছে পুরো বাংলাদেশ। দক্ষ হাতে গড়া অদ্ভুত সুন্দর এসব টেরাকোটায় রয়েছে ধারাবাহিকভাবে: বাংলা মায়ের মুখ, "রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই" শ্লোগানে তারুণ্যের আন্দোলন, পুষ্পনিবেদিত সালাম, বরকত, সফিক, জব্বারের শহীদ মিনার, ৭১ এর ৭ ই মার্চের ভাষণ আর উত্তাল জনসমুদ্র, পাকিস্তানীদের নির্বিচার গণহত্যা, বধ্যভূমির নৃশংসতা আর সব শেষে মুক্ত উড়ন্ত লাল সবুজ হাতে কাক্ষিত স্বাধীনতা। গ্রানাইটের ওপর রং ধূসর হওয়া টেরাকোটায় নিঁখুত ও হাই রিলিফের এসব কাজ যে কোন দর্শনার্থীকে মুগ্ধ করবে। এর পাশেই রয়েছে দৃষ্টিনন্দন একটি ঝর্ণা। স্মৃতি চিরন্তনের বেদীতে ওঠার জন্য সিঁড়ি ছাড়াও প্রতিবন্ধীদের জন্য রয়েছে একটি বিকল্প রাস্তা।

                              চিত্র:দৃষ্টিনন্দন ঝরণা

সুবিশাল বিস্তৃতি নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী কড়ই গাছের ছায়ায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্মৃতি চিরন্তন চিরকাল থেকে বলতে থাকুক আমাদের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর ইতিহাস আর এসব স্তম্ভের বুক চিরে নীরব চিৎকারে গীত হোক অমর সংগীত: "এক সাগরে রক্তের বিনিময়ে, বাংলার স্বাধীনতা আনল যারা, আমরা তোমাদের ভুলব না..."