Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

যানজটে নাকাল ঢাবি ক্যাম্পাস ; সমাধান কি শুধুই দুরাশা !

সাইয়েদুজ্জামান সোহাগ

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ০৫:১৭ এএম, ৮ নভেম্বর ২০১৭ বুধবার | আপডেট: ০৩:০৭ পিএম, ১৫ নভেম্বর ২০১৭ বুধবার

ঢাবিতে যানজট। ছবি: সাইয়েদুজ্জামান

ঢাবিতে যানজট। ছবি: সাইয়েদুজ্জামান

ক্যানসার রূপী যানজট যখন সমগ্র  ঢাকা শহরকেই গ্রাস করেছে তখন রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ন স্থানে অবস্থানকারী প্রাচ্যের  অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর কবল থেকে রেহাই পাবে এটা আশা করাটাই যেন দূরাশা !আর তাই তো  দুর্ভাগ্যজনকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আজ যানজটের কবলে নাকাল আর সেই সাথে লুণ্ঠিত হচ্ছে ঢাবির অতীত গৌরব আর স্বকীয়তা । বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের রাস্তায় অবাধে চলছে বহিরাগত যানবাহন। যানবাহনের নিয়ন্ত্রণহীন চলাচলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস যেন পরিণত হয়েছে শহর এলাকার নিয়মিত রুটে । বহিরাগত যানবাহনের অবাধ চলাচলের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্র যেন হারিয়ে যাচ্ছে । 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের সকল গেট দিয়ে বিভিন্ন ধরণের গাড়ি প্রবেশ করায় নিয়মিত যানজট লেগে থাকে ক্যাম্পাসে। এতে ৮ মিনিটের রাস্তা শিক্ষার্থীদের অতিক্রম করতে লাগে প্রায় ৩০ মিনিট সময়। যা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকে ব্যাহত করছে। সময়মত ক্লাসে পৌঁছতে যা সবচেয়ে বড় বাধা।

ক্যাম্পাসের মধ্য দিয়ে যানবাহানের অবাধ চলাচলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পড়ার জায়গা নয়, চিন্তা করার জায়গাও। এরজন্য দরকার একটি ভালো ও সুস্থ পরিবেশের। কিন্তু বহিরাগত যানবাহনের অবাধ চলাচলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সে পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব স্বকীয়তায়ও বিনষ্ট হচ্ছে।

জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, দোয়েল চত্বর, নীলক্ষেত মোড়, শহীদ মিনার চত্বর এবং পলাশী মোড়ে দিনে-রাতে সব সময়ই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতে হয় সাধারণ শিক্ষার্থী ও পথচারীদের। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় চলে মোটরসাইকেলের মহড়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা, ফুলার রোড, দোয়েল চত্বর ও মল চত্বরে প্রতিনিয়তই চলে গাড়ি প্রশিক্ষণ। এ কারণে ঘটছে সড়ক দূর্ঘটনার মতো নানা অপ্রীতিকর ঘটনা।

সমাজ কল্যাণ বিভাগের শিক্ষার্থী ওয়াসিফ বলেছেন, ‘মাঝে মাঝে মনে হয় এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস না, গুলিস্তানের কোনো সড়ক। অবাধ যানচলাচলের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেও যানজটের কবলে পড়তে হয়। এমন কোনো দিন নেই, নীলক্ষেত মোড়ের জ্যাম ভি.সি চত্তর পর্যন্ত আসে না।

চিত্র:  মহসিন হল মাঠের পরিণতি

শুধু ক্যাম্পাসই নয়, অনেক হলের মাঠেও বহিরাগত গাড়ি পার্কিং করা হচ্ছে নিয়মিত। বিভিন্ন হলের সামনে দেখা যায়, খেলার মাঠ দখল করে রয়েছে বেশ কিছু প্রাইভেট কার, ভ্যান, ঠেলা গাড়ি। সাথে অস্থায়ী দোকানও রয়েছে। 

 শুধু পার্কিং নয়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিভিন্ন রাজনৈতিক সমাবেশের কারণেও বন্ধ হয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তা। এতে ভোগান্তিতে পড়তে হয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। রাজনৈতিক সমাবেশের দিন টিএসসিসহ আশপাশের পাশের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গাড়ি পার্কিং করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে। এতে দূর্ভোগে পড়তে হয় বাইরে থেকে ক্লাস করতে আসা শিক্ষার্থীদের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) রাস্তায় প্রায় সবসময় যানজট দেখা যায়। সিএনজি চালিত অটোরিকশা, রিকশা রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রাইভেটকার, ট্যাক্সি আর অটোরিকশার জন্য পথচারীরা হাঁটতে পারেন না। এই যানজটের মধ্যেও মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকারগুলো উচ্চ গতিতে চলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে প্রতিনিয়ত কার, মোটরসাইকেল রেসিং করতে দেখা যায়। রাস্তার দু’পাশে নির্দিষ্ট গতিতে গাড়ি চালানোর নির্দেশনা সম্বলিত সাইনবোর্ড নেই।  শিক্ষার্থীদের এক পাশ হতে রাস্তা পার হয়ে অন্য পাশে যেতে বেগ পোহাতে হয়।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ প্রায় প্রতিদিনই ক্যাম্পাসে কোন না কোন শিক্ষার্থীকে বহিরাগতদের কারণে ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। ১৩ অক্টোবর দুপুরে বহিরাগত একটি প্রাইভেট কারের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডঃ আখতারুজ্জামানের পুত্র আশিকের পা ভেঙ্গে যায়।

এর পর ১৪ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১০ টায় ক্যাম্পাসের ভিসি চত্ত্বরে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় এক বৃদ্ধা আহত হয়। একই দিন দুপুরে ইডেন মহিলা কলেজের এক শিক্ষকের প্রাইভেট কারের ধাক্কায় ঢাবির এক ছাত্রের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে ।

 চিত্র: কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে তীব্র যানজট

এছাড়াও প্রতিদিন সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের সাথে সাথে ফুলার রোডসহ পুরো ক্যাম্পাসে বেড়ে যায় পুরান ঢাকাসহ ঢাকার অন্যান্য স্থানের উশৃঙ্খল কিছু ছেলেমেয়েদের আনাগোনা। তারা ঢাবি ক্যাম্পাসকে বাইক রেসের অন্যতম স্থান বলে মনে করে। তারা ক্যাম্পাসে কোন নিয়মের তোয়াক্কা না করেই খুবই দ্রুত গতিতে বাইক ও প্রাইভেট কার নিয়ে চলা ফেরা শুরু করে। এর ফলে নিয়মিত দূর্ঘটনার শিকার হচ্ছে ঢাবি শিক্ষার্থী, কর্মচারী এবং শিক্ষকরা।

কয়েক মাস আগে প্রাইভেটকার বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের বেদির ওপর উঠে পড়ে। এতে ভাস্কর্যের বেষ্টনী ও রেলিং ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো মানুষ হতাহত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরুর সময়ে দুর্ঘটনাটি ঘটলে হতাহত হতে পারত বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা আশঙ্কা করেন। কয়েক মাস আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সড়কে দুর্ঘটনায় এক পথচারী নিহত হন।

ঢাবি ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত মাত্রায় বহিরাগত যান চলাচলের ফলে দুর্ঘটনার কারণে বিগত ১০ বছরে অন্তত ১৬ জন নিহত হয়। সর্বশেষ গত ৫ আগস্ট শনিবার ভোর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সামনে সড়ক দুর্ঘটনায় শুভ্র নামের ঢাকা কমার্স কলেজের এক শিক্ষার্থী নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হন ইমরান নামে আরও একজন। এই ঘটনার মাত্র দুই দিন আগে গত ২ আগস্ট বুধবার বেলা দু’টার দিকে রোকেয়া হলের সামনের রাস্তা পার হওয়ার সময় উল্টোদিক থেকে আসা বাইকের ধাক্কায় আহত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং এন্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের এমবিএ’র এক ছাত্রী।

চিত্র: যানজটে নাজেহাল ঢাবি ক্যাম্পাস !

গণপরিবহন প্রবেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বাধা না পাওয়া, ক্যাম্পাসে যানজট কম থাকা, দুর্ঘটনার পর অল্পতেই পার পাওয়া, শাহবাগ-নিউমার্কেট এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ের তীব্র যানজট, পরিবহন মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতা, বেপরোয়া গতিতে যান চালানোর প্রবণতা, ছুটির দিনগুলোতে বহিরাগতদের ঢাবিমুখীতাকে ভোগান্তির জন্য দায়ী করছেন শিক্ষার্থীরা।

তবে আসার কথা হচ্ছে, সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ ক্যাম্পাসের ভেতরে পাবলিক বাসের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে । তবে এখনো অনেক পাবলিক বাসকে চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে ।

ক্যানসার রূপী যানজট যাতে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব ও স্বকীয়তাকে  নষ্ট করতে না পারে এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সুশীল সমাজের  যৌথ প্রয়াস অত্যাবশ্যক । আমাদের ভুলে গেলে চলবে না , ঢাকা শহরের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়া মানে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ই নষ্ট হওয়া।

ঢাবির টিএসসি চত্ত্বরের দৈনন্দিন যানজটের চিত্র-

ইউটিউব ভিডিও: ঢাবি ক্যাম্পাসের যানজট (টিএসসি)