Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

হাকিমের এক কাপ চা, এক চামচ আড্ডা আর এক চিমটি ইতিহাস!

ফারজানা ফেরদৌসি

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ০৮:৫২ এএম, ৮ নভেম্বর ২০১৭ বুধবার | আপডেট: ০৯:০০ এএম, ৮ নভেম্বর ২০১৭ বুধবার

হাকিমের এক কাপ চা, এক চামচ আড্ডা আর এক চিমটি ইতিহাস!

হাকিমের এক কাপ চা, এক চামচ আড্ডা আর এক চিমটি ইতিহাস!

বিচ্ছিন্নতার মাঝেও লুকিয়ে আছে এক অবিচ্ছিন্নতা, একতা। দূর থেকে দেখলে মনে হয় এ কেমন জায়গা? সবকিছু আলাদা আলাদা, ছন্নছাড়া! কিন্তু না, একটু কাছে গেলেই পাওয়া যায় তার সম্মিলিত সত্ত্বার ছোঁয়া। শিক্ষা-শিল্প-সংস্কৃতি, স্বপ্ন-সাফল্য-সংগ্রাম, ইতিহাস এবং ঐতিহ্য দিয়ে ঘেরা এই জায়গাটির নাম হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে একটি অত্যন্ত স্বনামধন্য এবং আলোক উজ্জ্বল বিশ্ববিদ্যালয়। যাকে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডও বলা হয়। একটি দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠের পাশাপাশি একটি দেশের জন্মদাতা হওয়ার গৌরব রয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের।

২৫০ একর জুড়ে বিস্তৃত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি জায়গাই ইতিহাসের সাথে বর্তমান সংযোগ। যেখানে গেলেই চোখে পড়ে মনোরম পরিবেশ, আকর্ষণীয় সব জায়গা, প্রেরণার উৎস বিভিন্ন ঐতিহাসিক ভাষ্কর্য এবং তরুণের মেলায় উচ্ছ্বাসিত বিভিন্ন চত্বর, যা সবই এক একটি ইতিহাসের জীবন্ত স্মারক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন চত্বরের মধ্যে রয়েছে মল চত্বর, শ্যাডো চত্বর, অলস, ডাচ, বুদ্ধিজীবী, হাকিম চত্বর, সমাজিক-বিজ্ঞান চত্বর ইত্যাদি। যেখানে প্রতিনিয়তই একত্রিত হয় ভবিষ্যৎ, অতীত ও বাধ-ভাঙ্গা যৌবনের উচ্ছ্বাস। তবে, হাকিম চত্বর এসব চত্বরের মধ্যে অন্যতম যার রয়েছে ভিন্ন রকম এক গল্প।

এক ছিল মাঠ। তার দুদিকে লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা সীমানা প্রাচীর। একদিকে বিশাল তিন-তালা এক ভবন। সামনে দিয়ে চলে গেছে এক রাস্তা। মাঠে শীত ছাড়া অন্ন সময়ে সবুজ ঘাস মাটি কামড়ে থাকে। মাঠের সীমানার আগে কাঁটা মেহেদির ঝোপ। এই মাঠের একপাশে বড় রাস্তার দিকের সীমানা ঘেঁষে ছোট্ট ছন্নছাড়া এক চায়ের দোকান, মাথার উপর বটের ছায়া, দোকানের মালিক হাকিম মিয়া। হাকিম চত্বরের হাকিম ভাই।

চিত্র: হাকিম মিয়ার স্মরণে শিক্ষার্থীদের তৈরি লোগো

১৯৬৭ সালের কথা। মাত্র ১৫ বছর বয়সে জীবনটাকে যেন নতুন করে আবিষ্কার করেছিলেন দোহারের কিশোর হাকিম। সংসারে অভাব থাকায় কাজের সন্ধানে বাবার হাত ধরে পাড়ি জমিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পবর্তীতে ষাটের দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই চা বিক্রেতার নামেই নামকরণ করা হয় এই বিখ্যাত হাকিম চত্বরের।

হাকিম চত্বরে থাকা বট গাছের নিচে ছোট্ট দোকান নিয়ে চায়ের ব্যবসা শুরু করেছিলেন হাকিম মিয়া। প্রথমদিকে চায়ের পাশাপাশি পাউরুটি, বিস্কুটও বিক্রি করতেন তিনি। তারপর ধীরে ধীরে হাকিম মিয়ার চা অধিক জনপ্রিয় হয়ে উঠে সকলের কাছে। জীবনের ৩৫ টি বসন্ত তিনি কাটিয়েছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি তার ভালবাসাও ছিল গভীর। ৬৯-এর গণুভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচন, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্যা ঘটনার নীরব সাক্ষী ছিলেন হাকিম মিয়া। তিনি ছিলেন ছাত্র-ছাত্রীদের পোষ্ট বক্স। যার যা খবর, কাউকে কিছু বলার থাকলে সেটা হাকিম মিয়াকে বললেই হত। খবর পৌঁছাতে ভুল হত না কখনো।

মাঝারি গড়ন, মাথায় চুলের স্বল্পতা নিয়ে হাসি খুশি মুখের মানুষ ছিলেন সবার প্রিয় হাকিম মিয়া। ষাটের দশকে আড্ডার ফাঁকে গলা ভেজানোর একমাত্র রসদ ছিল হাকিম মিয়ার চা। তার সাথে হাকিম মিয়ার হাসিমাখা মুখের অমায়িক ব্যবহার ছিল উপরি। তাইতো শত ব্যস্ততার মাঝেও দিনের শেষে ক্লান্তি মেটাতে এককাপ চা খেতে সবাই ছুটে যেতেন হাকিম মিয়ার কাছে। শিক্ষার্থীদের কাছে অসম্ভব প্রিয় ছিলেন তিনি। আশির দশকের মাঝামাঝি কোন একসময়ে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ হাকিমের চায়ের দোকান তুলে দিতে চাইলে ছাত্ররা প্রতিবাদ করে। এমনকি ঘটনা গড়িয়েছিল স্মারক লিপি দেওয়া পর্যন্ত। কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীর সহযোগী গ্রন্থাগারিক আবু তাহের দেওয়ান বলেন,

“ সেই ৭৮ সালে থেকে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত খুব কাছ থেকে হাকিম ভাইকে দেখেছি। তার ভাল মানুষির কোন তুলনা হয়। কত যে ফ্রি চা খেয়েছি তার ও কোন হিসাব নেয়। ছাত্ররা তাকে অসম্ভব ভালবাসত, শ্রদ্ধা করত। এখনও অনেক বড় বড় মানুষ হাকিম ভাইয়ের মৃত্যু বার্ষিকীতে তাকে স্মরণ করে মিলাদ দেয় এই চত্বরে”।

চিত্র: হাকিম চত্বেরের বর্তমান অবস্থা

বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী ঘেরা সবুজ চত্বরটিই হাকিম চত্বর নামে পরিচিত। তখনকার সময়ে জায়গাটি এত পরিপাটি ছিল না, অনেকটা জঙ্গলের মতো ছিল। হাকিম মিয়ার দোকানে সবসময় ভিড় লেগেই থাকত। তার চায়ের দোকান ঘিরে আড্ডার সুঘ্রান এতটাই বিস্তৃত হয়েছিল যে এই মাঠের নাম হয়েছিল হাকিমের মাঠ। তবে হাকিম চত্বর প্রসিদ্ধি পায় মূলত তার মৃত্যুর পর। ২০০০ সালের পর থেকে। হাকিম মিয়ার মৃত্যুর পর তার ছেলে এখানে ব্যবসা করতে এলে নানান চাপে পড়ে মাত্র তিন মাস পরেই তিনি এ চত্বর ছেড়ে চলে যান। পরবর্তীতে নান্নু নামের একজন চা বিক্রেতা এখানে নতুন দোকান দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন।

চিত্র: প্যানোরমা চিত্রে সমগ্র হাকিম চত্বর

এখনো সেই সময়কার ছাত্র-ছাত্রীদের অনেকেই ছুটির দিনে সময় পেলে হাজির হন হাকিম চত্বরে। তবে এখন আর গল্পের ফাঁকে খাওয়া হয় না হাকিম মিয়ার চা। তাইতো বর্তমান নান্নুর দোকানে ঝোলানো হাকিম ভাইয়ের সদা হাস্যজ্জ্বল একটি ছবিই তাদের মনে করিয়ে দেয় পুরোনো দিন গুলোর কথা।

বর্তমান ছাত্র-ছাত্রীদের ও আড্ডার কেন্দ্রস্থল এই হাকিম চত্বর। এখানে আগের মতই আড্ডা জমে, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত মিলিত হয় প্রাণের উচ্ছ্বাসে কিন্ত নেই শুধু হাকিম মিয়া এবং তার প্রতি বর্তমানদের আবেগ। হাকিম মিয়াকে দেখার ভাগ্য যেমন তাদের হয়নি তেমনি হাকি্মের এবং এই চত্বরের গল্পও অনেকের কাছে অজানা।