Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

অযত্ন-অবহেলায় হারিয়ে যাওয়ার পথে ২০০ বছরের স্মৃতিচিহ্ন ‘ঢাকা গেইট’

মো. চুন্নু খান

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ১১:৫৮ পিএম, ৭ নভেম্বর ২০১৭ মঙ্গলবার | আপডেট: ১২:০২ এএম, ৮ নভেম্বর ২০১৭ বুধবার

চিত্র: ঐতিহাসিক ঢাকা গেটের জরাজীর্ণ অবস্থা

চিত্র: ঐতিহাসিক ঢাকা গেটের জরাজীর্ণ অবস্থা

রাজধানীর প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেই ক্যাম্পাসজুড়ে রয়েছে অসংখ্য প্রাচীন স্থাপনা। এগুলো শত শত বছর ধরে দেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে। এসব স্থাপনার মধ্যে ঐতিহাসিক ঢাকা গেট অন্যতম। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার সমৃদ্ধ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে শতাব্দী প্রাচীন এই গেট। কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরে অবহেলা আর সংস্কার না করার ফলে কালের সাক্ষী গেটটি আজ হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।                                                                                                                                    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বর থেকে টিএসসির দিকে যাওয়ার মূল সড়কের মুখেই অবস্থান গেটটির। তিনটি অংশে বিভক্ত গেটটি। এ গেটের তিনটি অংশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নবায়নযোগ্য শক্তি গবেষণা কেন্দ্রের দিকে, মাঝখানের অংশ পড়েছে সড়ক বিভাজকের দিকে এবং অপর অংশটি রয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের তিন নেতার মাজারের পাশে। বর্তমান চেহারায় গেটটিকে যতোটা ছোট দেখা যায়, আগে তা এত ছোট ছিল না বলেই ধারণা করেন ইতিহাসবিদরা। অযত্ন আর অবহেলায় এবং চারদিকে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠায় গেটটির আকার ছোট হয়ে গেছে। 

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ঢাকা গেট এখন আর আগের সেই অবস্থায় নেই। অত্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় থাকা গেটটি যেন বিদায়ের প্রহর গুনছে। দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের সংস্কার বা যত্ন ছাড়াই অবহেলিত ঢাকা গেট। যত্নের অভাবে খসে পড়েছে এর দেয়ালের ইট-চুন-সুরকি। স্থাপনার সৌন্দর্যও ইতোমধ্যে ধ্বংসের পথে। ঢাকা গেটের বর্তমান স্থাপনা দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না এটি একটি ঐতিহ্যবাহী গেট। জনমানুষের চোখের আড়ালে, গাছ ও লতাপাতায় মোড়ানো এ গেট এখন আর কারো নজর কাড়ে না।অনেকে আবার নাম শুনেছেন অথচ কখনো খুঁজে পাননি ঐতিহাসিক এ স্থাপনা। ২০০ বছরের স্মৃতিচিহ্ন হারিয়ে যাচ্ছে এভাবেই।      

সূত্র জানায়, ঢাকা গেট নামকরণে বিভিন্ন তথ্যভেদ রয়েছে। মোগল আমলে বুড়িগঙ্গা নদী হয়ে ঢাকায় প্রবেশ করতে ব্যবহার করা হতো এ তোরণ। সেসময় এর নাম ছিল ‘মীর জুমলার গেট’। পরে কখনও ‘ময়মনসিংহ গেট’, কখনও ‘ঢাকা গেট’ এবং অনেক পরে নামকরণ করা হয় ‘রমনা গেট’। এ গেট রমনায় প্রবেশ করতে ব্যবহার করা হতো বলে পরে সাধারণ মানুষের কাছে এটি রমনা গেট নামেই পরিচিতি পায়। তবে বাংলাদেশ সরকারের গেজেট অনুসারে এ তোরণ এবং আশপাশের জায়গার নাম দেয়া হয়েছে ‘মীর জুমলার গেট’। অপর এক তথ্যে বলা হয়, ইসলাম খাঁর আমলে রমনা অঞ্চলে ছিল বাগে বাদশাহী নামে মোগল উদ্যান। বাগে বাদশাহীর প্রবেশপথে ছিল দুটি স্তম্ভ। পরে তা পুনর্নির্মাণ করে নামকরণ করা হয় ময়মনসিংহ গেট।

ধারণা করা হয়, মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের বাংলার সুবেদার মীর জুমলা রমনা অঞ্চলে গেটটি নির্মাণ করেন। ঢাকা নগরীকে উত্তর দিক থেকে মগদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য এই প্রবেশদ্বারটি নির্মাণ করা হয়েছিল। বর্তমান অবশিষ্ট গেটের স্থাপনাটি মোগল আমলের নয়। এটি ইংরেজ আমলে নির্মিত হয়েছিল। এদিকে এ ঐতিহাসিক স্থাপনার স্তম্ভগুলো মোগল আমলের নয় বলে মনে করেন অনেকেই। ইতিহাসবিদ ও `ঢাকা` গ্রন্থের লেখক আহমদ হাসান দানী স্তম্ভ দুটি পরীক্ষা করে জানিয়েছেন, মোগল আমলে বর্তমান গেটটি তৈরি হয়নি। তাছাড়া স্তম্ভ দুটোর গড়ন ইউরোপীয় রীতির।

চিত্র: ঢাকা গেটের রোড ডিভাইডার অংশ

প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের এ ধরনের স্তম্ভ খুবই বিরল। মূল শহরের সঙ্গে রেসকোর্সকে যুক্ত করার জন্য রেসকোর্সের উত্তর-পূর্ব দিকে একটি রাস্তা তৈরি করেন তত্কালীন ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ডস। এ রাস্তার প্রবেশমুখে তিনি দুটি স্তম্ভ তৈরি করেন। বর্তমান নজরুল এভিনিউয়ের রাস্তাও প্রথমে ডস তৈরি করেন। ১৮২০ থেকে ১৮২৫ সালের মধ্যে এ গেট নির্মিত হয়েছিল বলে মনে করেন ইতিহাসবিদরা। বাংলাপিডিয়া এবং মুনতাসীর মামুন লিখিত ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরীতে এর সমর্থনে তথ্য পাওয়া যায়। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়োর হোসেন বলেন, আমাদের ঢাকার যে ক’টি নিদর্শন ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎস তার মধ্যে মোগল আমলের ঢাকা গেট অন্যতম। এর সাথে ঢাকার অর্থনৈতিক, সামাজিকসহ অনেক ইতিহাস জড়িত। এটি নষ্ট হলে আমাদেরকে স্মৃতিহীন হয়ে যেতে হবে। যে যা বলবে তখন তাই মেনে নিতে হবে। সুতরাং এখনি এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। প্রয়োজনে এর সাথে সংশ্লিষ্টদের বাধ্য করতে হবে এ ধরনের নিদর্শন রক্ষা করার জন্য।

ঐতিহ্যবাহী হলেও ঢাকা গেটের পাশে এটি সম্পর্কিত তথ্য জানানোর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এর যত্ন নিতে সুনির্দিষ্টভাবে কারো দায়িত্বও নেই। এভাবে অযত্নে থাকলে ধীরে ধীরে গেটটি হারিয়ে যাবে। যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গেটটি অবস্থিত সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রও গেটটি সম্পর্কে জানেন না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের ছাত্র মিলন হোসাইনকে ঢাকা গেট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যে তিনি এর নাম শুনেছেন এবং বতর্মানে তার জরাজীর্ণৃ অবস্থা বলেও শুনেছেন। তিনি আরো বলেন, “আমাদের দেশে অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে। কিন্তু তার রক্ষণাবেক্ষণ ঠিক মতো হচ্ছে না যার ফলে আজ সেগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। আমরাও হাজার বছরের স্মৃতি ভুলে যেতে বসেছি”।    

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালেয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আকতারুজ্জামান বলেন, “এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত বটে তবে তার রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্ব সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের। আমরা বড় জোর গেইটের বতর্মান অবস্থা সম্পর্কে তাদের অবহিত করতে পারি।      

এটিকে বাংলাদেশেরে ঐতিহাসিক স্থাপনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের যে ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের আইন আছে, যে আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিভাগকে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাহলেই এসব ঐতিহ্য হাজার বছর টিকে থাকবে ইতিহাসের স্তম্ভ্ হয়ে।