Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

আত্মহত্যা প্রতিরোধে হ্যাপি ডিইউ

সুমাইয়া আরেফিন অর্ণি

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ০১:৩৫ পিএম, ২৮ অক্টোবর ২০১৯ সোমবার

ছবিঃ হ্যাপি ডিইউ এর পরিচালক শিক্ষার্থীরা   

ছবিঃ হ্যাপি ডিইউ এর পরিচালক শিক্ষার্থীরা  

২০১৮ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে, ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থী ‘তরুণ’ আত্মহত্যা করে। তৃতীয় বর্ষে পড়া তরুণের বন্ধুদের দাবী, পরীক্ষার ফলাফল আর পরিবারের অসচ্ছ্বলতার কারণেই সবসময় বিষণ্ণ থাকতেন তরুণ।  

তরুণের আত্মহত্যার খবর সবাইকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে। দেশসেরা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সারির একটি বিষয়ে পড়ে কেনো একজন মানুষকে এতটা  হতাশা ও হীনমন্যতায় ভুগতে হবে। সবাই যখন চিন্তাভাবনা করছিলেন তখন হাতে হাত রেখে বসে না থেকে এগিয়ে এসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীই।  

তাদের একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন  ছাত্র মুসাব্বির হোসেন। তরুণের মৃত্যুর পর  আত্মহত্যা প্রতিরোধে কিছু একটা  করার চিন্তাভাবনা করেন যার ফলাফল ‘হ্যাপি ডিইউ’। হ্যাপি ডিইউ কাজ শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে।

হ্যাপি ডিইউ এর সাথে শুরু থেকেই আছেন  একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইশরাত জাহান ইমু এবং তার সহপাঠী মোঃ আতিকুর রহমান।

এরপর একে একে তাদের সাথে যুক্ত হন ব্যাংকিং এন্ড ইন্সুরেন্স বিভাগের প্রাক্তন ছাত্রী তাহমিনা আখতার , দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের কাইফা ইব্রাহিম , একাউন্টটিং & ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের  শায়লা ইসলাম   ও সাইকোলজি বিভাগের সাদিয়া আফরোজ শামস ।

ইশরাত জাহান ইমু বলেন, “আমাদের ডিপার্টমেন্টের  সহপাঠীরাও বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে সাহায্য করেছে ‘হ্যাপি ডিইউ’ এর যাত্রায় । আমাদের সম্মানিত শিক্ষক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের  সাইদ সিদ্দিক স্যার ও ফিশারিজ ডিপার্টমেন্টের  মোঃ মামুন চৌধুরী স্যার শুরু থেকেই অনেক উৎসাহ দেন”।

 

 

 

হ্যাপি ডিইউ এর বেশিরভাগ কাজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক কেন্দ্রিক। প্রথমেই তারা ফেসবুকে ‘হ্যাপি ডিইউ’ নামে একটি গ্রুপ শুরু করেন।

 গ্রুপ খোলার প্রায় সাথে সাথেই তারা একটা গুগল ফর্ম চালু করেন - যার নাম তারা দেন ‘মনের চিঠি’  । এখানে যে কেউ নিজের নাম-পরিচয় গোপন রেখে নিজের কষ্ট বা হতাশার কথাগুলো বলতে পারেন। যাদের সাথে পরবর্তীতে যোগাযোগ করা  প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন তারা তাদের যোগাযোগের ঠিকানা দিতে পারেন।  এছাড়া ফেসবুক পেজের ইনবক্সেও যে কেউ তাঁর নিজের সমস্যাগুলো শেয়ার করতে পারেন ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিতে পারেন। ইশরাত বলেন, “আসলে চরম হতাশাগ্রস্ত সময়ে কাউকে মুখ ফুটে কিছু বললেও মনটা অনেক হালকা হয়। বিশেষ করে বেশিরভাগ হতাশার মূল কারণই দেখা যায় প্রেমে বিচ্ছেদ বা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থতা”।

 

 ‘মনের চিঠি’ পাঠানোর জন্য গুগল ফর্মের আয়োজন করাটা ছিল আতিকের বুদ্ধি , যা তাদের কার্যক্রমের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিঃসন্দেহে ।

তারা মনের চিঠি থেকে প্রাপ্ত চিঠিগুলো পরিচয় গোপন রেখে তাদের ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট করেন। সেখানে এডমিনরা ছাড়াও বিভিন্ন মানুষজন বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এক কথায় মানুষ মনের কথা বলার মানুষ খুঁজে পায়।   

 

দ্বিতীয়ত কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে কারও সাথে মনের কথা শেয়ার করতে চায় তবে হ্যাপি ডিইউ এর সদস্যরা সিনিয়র কারও সাথে পেজের মাধ্যমে যোগাযোগ করিয়ে দেন। যারা যোগাযোগ করত তাদেরকে অভিজ্ঞ সাইক্রিয়াটিস্টের সহায়তা নেবার জন্য উদ্ধুদ্ধ  করা হয়। তবে বেশরভাগই সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে  যাবার চেয়ে বয়সে বড় কাউকে নিজের কথা গুলো খুলে বলাই বেশি পছন্দ করত।

 

বিষণ্ণতার মূল কারণ হিসেবে অনেকেই নিজের আর্থিক সমস্যার কথা বলতেন। হ্যাপি ডিইউ এর সামাধানেও এগিয়ে এসেছিল।

অনেকেই যারা আর্থিক কারণে বিষণ্ণতায় ভোগেন –তাদের জন্য টিউশন জোগাড় করে দেবার একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এই উদ্যোগ সফল হয় নি।

 অনেক চেষ্টার পর হ্যাপি ডিইউ থেকে ‘ইমরান নাহার বৃত্তি’র ফান্ড জোগাড় করা হয়। এই বৃত্তি শুধুমাত্র ফলাফল দেখে দেওয়া হয় নি। যাচাই বাছাই করে যাদের আসলেই অর্থের জন্য হতাশ মনে হয়, তাদের নির্বাচিত করা হয়।  ১৫ জনকে ২ মাস দেওয়া হয়। এরপর ফান্ডিং অফ হয়ে যাওয়ায়,  বৃত্তিও বন্ধ করে দেওয়া হয়। 

হ্যাপি ডিইউএর উদ্যোক্তাদের ইচ্ছা ছিল একটা এলমনাই কমিটি তৈরি করা। ইন্টারনেটের চেয়ে বেশি সরাসরি কাজ করতেই তারা বেশি চাইছিলেন। কিন্তু  প্রয়োজনীয় লোকবলের তা আর সম্ভব হয়নি। এখন মূলত তারা অনলাইনেই পরামর্শ বা প্রয়োজনীয় কিছু করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

স্বপ্নবাজ এই শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে হ্যাপি ডিইউ থেকে কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করতে চান। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এই গ্রুপের দেখাদেখি মানসিক স্বাস্থ্যের সহায়তা দিতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। তাদের সবার লক্ষ্য হল না বলা কথা বুকে চেপে যেন হারিয়ে না যায় আর একজন মানুষও!