Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি জ্ঞান চর্চা নাকি চাকরির পড়াশুনার আতুরঘর

এস.এম. তৈমুর

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ১২:০৫ পিএম, ৪ নভেম্বর ২০১৯ সোমবার | আপডেট: ০২:২৮ পিএম, ৪ নভেম্বর ২০১৯ সোমবার

ভোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়  কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি এলাকা

ভোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি এলাকা

 

জ্ঞান অর্জনের জন্য শয়তানের কাছে আত্মা বিক্রি করেছিলেন ড. ফাউস্ট। জ্ঞান চর্চার বিনিময়ে নরকে যেতেও রাজি ছিলেন। বিখ্যাত জার্মান লেখক গ্যাটের ‘ফাউস্ট’ নাটকে আমরা এমনটিই দেখতে পাই। তবে বাস্তবে জ্ঞান চর্চার জন্য জ্ঞানপিপাসুদের অদ্ভুত সব কার্যক্রমের কথা আমরা প্রায় শুনে থাকি।আবার অন্য দিকে জ্ঞান বিতরণের জন্য পালন সরকারদের ব্যতিক্রমী উদ্যোগও চোখে পড়ে।তবে আজ একটু  ভিন্ন গল্প বলবো।

বাজার অর্থনীতির এই যুগে দেশে দেশে বাজার দখলের যুদ্ধের  কথা আমরা প্রায়শই শুনি। কিন্তু গ্রন্থাগার বা লাইব্রেরিতে পড়ার জন্য জায়গা পাওয়ার জন্য রীতিমত যুদ্ধের কথা শুনে অনেকে হয়তে আবাক হবেন।তবে ঢাকা  বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির বাস্তবতা এমনই।এখানে পড়ার জায়গা পাওয়ার জন্য প্রতিনিয়তই তীব্র প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হতে হয় শিক্ষার্থীদের।

কাক ডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়েই ঢাকা  বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন আবু মুসা।লক্ষ্য পরবর্তী বারো চৌদ্দ ঘন্টা পড়ার সুন্দর একটা পরিবেশ নিশ্চিত করা ।তার মত এমন লক্ষ্য প্রায় হাজারো শিক্ষার্থীর ।সবার ইচ্ছা থাকে একট ুসকালে পৌছানোর ।আগে গেলে আগে সিরিয়াল পাবে এই পদ্ধতিতে সারিবদ্ধভাবে ব্যাগ রেখেন শিক্ষার্থীরা।

ঢাবি লাইব্রেরি খোলা হয় সকাল ৮ টায়। মুসা প্রতিনিয়তই সকাল ৬টা ৩০ মিনিটের দিকে লাইব্রেরি চত্বরে পৌছে যান।ব্যাগ রেখে সিরিয়াল নিশ্চিত করার পর বাকি সময় কাটান কখনো গান শুনে, কখনো বা কফি খেতে খেতে পত্রিকার পাতায় চোখ বুলিয়ে।আবার কখনো বা ম্যাগাজিন পড়ে ।

লাইব্রেরির গেট খোলার সময় লেগে যায় আরেক যুদ্ধ। কেউই যেন মানতে চান না সিরিয়াল।সবাই আগে যেতে চান। তবে কর্তৃপক্ষ সিরিয়াল ব্যতীত অন্য কউকে ঢুকতে দেয় না । তাই কষ্ট হলেও সিরিয়াল দিয়ে জায়গা পাওয়া যায়।

মোটামুটি সকাল সোয়া আটটার দিকে জায়গা নিশ্চিত করতে পারেন পরবর্তী বারো বা চৌদ্দ ঘন্টা পড়াশুনার।বছরের ৩৬৫ দিনের বেশির ভাগই দিনই এমনভাবে কাটে আবু মুসার। শুধু আবু মুসা নয় তার মত এমন হাজারো শিক্ষার্থী এমন যুদ্ধের মাধ্যমে  পড়ার জায়গা নির্ধারণ করেন।তবে এত কষ্টের পরও অনেককে জায়গা না পেয়ে ফিরে যেতে হয়। 
আবু মুসা ইসলাম ইতিহস ও সংস্কৃতি বিভাগের  ৪র্থ বর্ষে শিক্ষার্থী।এখানে চাকরির পড়া পড়েন।বিশেষ করে বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুিত নেন তিনি।

দর্শন বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী নাইমুর রহমান  বলেন, তিনি চাকরির পড়ার পাশাপাশি  নিয়মিত পত্রিকা পড়ার জন্য এখানে আসেন।   



অধিকাংশ শিক্ষার্থী মনে করেন লাইব্রেরি সিটসংখ্যা আরো বাড়ানো উচিত।তবে তারা বলেন লাইব্রেরির কর্মকর্তা কর্মচারী তাদের প্রতি অত্যন্ত আন্তরিক।অনেক সময় তারা নিজেদের টেবিলের জিনিসপত্র পাশে রেখে শিক্ষার্থীদের পড়ার জায়গা করে দেন।

সিট সংকটের ব্যাপারে জানতে লাইব্রেরির প্রশাসনিক প্রধান অধ্যাপক ড. এস এম জাভেদের আহমদ কার্যলয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যাননি। তবে প্রধান কর্মকর্তার অনুপস্তিতে সহকারী লাইব্রেরিয়ান মোহম্মদ আবু কাউসার বলেন,সাম্প্রতিক সময়ে লাইব্রেরির সিট সংখ্যা ৬৫০ থেকে প্রায় ১৫০০ তে উন্নীত করা হয়েছে। শুধু তাই নয় লাইব্রেরির সুযোগ সুবিধা আগে থেকে আরো বেশি
বৃদ্ধি করা হয়েছে।লাইব্রেরি মর্গে(পুরাতন পত্রিকার সংরক্ষণাগার) রাখা পত্র-পত্রিকা অনলাইন এ পাবলিস করার প্রক্রিয়া অতি দ্রুত চলছে।আর কিছু দিনের মধ্যে সেটা  বিশ্ববিদ্যালয় ওয়েবসাইটে প্রকাশকরা হবে।নাম মাত্র নির্দিষ্ট ফি’র বিনিময়ে শিক্ষার্থীরা সেটা ব্যবহার করতে পারবে।

লাইব্রেরিতে প্রাপ্ত, ২০১৪-১৫ সালে বিশ^বিদ্যালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়,লাইব্রেরি বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৭ লাখের মত।আর ঐ বছরই ই-জার্নাল নামানো হয় প্রায় সাড়ে ৪  লাখ।২০১৪-১৫ অর্থ বছরে লাইব্রেরির বা জেট ছিলো ২০৩.৫০ লাখ টাকা।যায় মধ্যে বই ও জার্নাল বাবদ খরচ হয়েছে ১২০ লাখ টাকা ।

তবে  অদ্ভূত ভাবে পরিলক্ষিত হয় লাইব্রেরির পাঠকক্ষ ব্যবহারের জন্য শিক্ষার্থীরা তীব্র প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হলে ও বই বা জার্নাল ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।২০১৩-১৪ বছরে দিনে গড়ে বই ব্যবহারের সংখ্যা ছিলো ৪০০৫.৯৬ টি। আর পরবর্তী বছরে সেটা কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৩০০০ এর কিছু বেশিতে।


এমনটি কেন হচ্ছে জানতে চেয়েছিলাম,শিক্ষর্থীদের সাথে বই লেনদেন  ও পাঠ কক্ষ দেখা শোনার শাখার কর্মচারী মি.কামালের কাছে। তিনি এখানে ১২ বছর ধরে কাজ করেন।তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, শিক্ষার্থীর আগের মত লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে পড়াশুনা করেনা। দিনকে দিন এই সংখ্যা আরে কমে যাচ্ছে। শিক্ষর্থীরা বাইরে থেকে ব্যাগে করে যে বইপত্র নিয়ে আসে সেটাই পড়ে।আর এ্ই বই পত্রের অধিকাংশই চাকরি পড়াশুনা সংক্রান্ত।

মূল্যবান বই না পড়ে তারা গতানুগতিক চাকরির পড়া পড়ছে।এমনভাবে যদি চলে তা হলে  বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যে লক্ষ্য সেটা বিচ্যুত হবে।পথ হারাবে জাতি। তাই  বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত বই পড়ার আগ্রহ সৃিষ্টসহ এই বিশাল জ্ঞান ভান্ডারকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে শিক্ষার্থীদের উৎসাহীত করা।