Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

কেন নাটক?

||রামেন্দু মজুমদার, নাট্যব্যক্তিত্ব||

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ০৯:০১ পিএম, ২৩ জুলাই ২০১৮ সোমবার | আপডেট: ০৭:৩৭ পিএম, ১ আগস্ট ২০১৮ বুধবার

কেন নাটক?

কেন নাটক?

এ প্রশ্নের তিনটা দৃষ্টিকোণ রয়েছে। এক, শিল্প মাধ্যম হিসেবে কেন নাটক? দুই, আমি কেন নাটক করি? তিন, দর্শক কেন নাটক দেখেন? শুরুতেই মৌলিক এ জিজ্ঞাসাগুলো নিরসন করে অন্যান্য আলোচনায় যেতে চাই।

প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রমতে দেবরাজ ইন্দ্র সৃষ্টির দেবতা ব্রহ্মাকে অনুরোধ করেছিলেন সকল শিল্প থেকে আহরণ করে একটি তিলোত্তমা শিল্প রচনার- যে শিল্পচর্চায় দেবতা, দানব ও মানব Ñ সকলের অধিকার থাকবে। ব্রহ্মা চার বেদ থেকে উপাদান সংগ্রহ করে রচনা করলেন পঞ্চম বেদ- নাট্যবেদ। নৃত্য, গীত, বাদ্য ও অভিনয়ের সংমিশ্রণে তৈরি হল নাটক যাকে আমরা দৃশ্যকাব্য হিসেবে অভিহিত করে থাকি। কোন শিল্পমাধ্যম শ্রেষ্ঠ- সে তর্কে না গিয়েও আমরা প্রত্যক্ষ করি নাটকে সব শিল্পেরই সমাহার রয়েছে।

আবার এটাও আমরা জেনেছি যে, ভাষা তৈরি হবার আগেই অনুকৃতি থেকে এক ধরনের নাটক সৃষ্টি হয়েছিল। গুহা মানবেরা পশু শিকার করে আবাসে ফিরলে অনুকরণ করে দেখাত কী করে শিকার করল। তাই প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সকল বিবেচনায়ই পৃথিবীর প্রাচীনতম শিল্পমাধ্যমগুলোর মধ্যে অন্যতম নাটক। নাটকের চর্চা হয় না- পৃথিবীতে এমন দেশ হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে না। কঠোর ধর্মীয় বিধিনিষেধের দেশ সৌদি আরব থেকে শুরু করে বরফ ঢাকা আইসল্যান্ড- সবখানেতেই আজকাল থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত শিল্প মাধ্যম।

কথায় আছে, একটি জাতিকে চেনা যায় তার থিয়েটার দিয়ে। জ্ঞানতাপস অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক বলতেন, ‘কোন নতুন দেশে গেলে দুইটা জায়গায় যাইবেন- কাঁচাবাজারে আর বইয়ের দোকানে। দেখবেন ওরা কী খায় আর কী পড়ে।’ খাদ্যাভ্যাস আর পাঠাভ্যাস দেখে একটি জাতির সভ্যতা আর সংস্কৃতির মান নির্ণয়ের কী সহজ পন্থা! যাই হোক্, নাটকে উঠে আসে সমাজের ছবি। চারপাশের মানুষের আনন্দ-বেদনা, আশা-আকাক্সক্ষা। নাটক যেভাবে সহজে মানুষকে স্পর্শ করতে পারে, অন্যকোন শিল্প মাধ্যমের পক্ষে তা সম্ভব হয় না। আর বিনোদনের একটা প্রধান মাধ্যম নাটক Ñ সে কথা তো বলার অপেক্ষা রাখে না।

এবার দ্বিতীয় প্রশ্নে আসি। আমি বা আমরা কেন নাটক করি? সবার কথা জানিনা, তবে আমি নাটক করি প্রধানত আমার নিজের জন্যে। নাটক করে আমি আনন্দ পাই। একটা সামাজিক দায়বোধ থেকে আমি নাটক করি। যেহেতু আমি নিজেকে সমাজের একজন সচেতন ও দায়িত্ববান মানুষ মনে করি, তাই নাটকের মধ্য দিয়ে আমি কিছুটা হলেও কর্তব্য পালন করি। নাটকের মাধ্যমে সমাজ বদল করা যায় না, তবে সমাজকে সচেতন করা যায় নাটককে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। আমি বিশ্বাস করি আমরা সকলেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে কাজ করি মানুষের কল্যাণে, দেশের স্বার্থে। আমি যা বলতে চাই বা যা বিশ্বাস করি তার প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে নাটককে বেছে নিয়েছি। গত প্রায় ছয়দশক ধরে সচেতনভাবে নাটকের সাথে জড়িত থাকার ফলে নাটক এখন আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছে। নাটকবিহীন জীবন এখন কল্পনা করতে পারি না। নাটকের কারণেই দেশেÑবিদেশে মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, সম্মান পেয়েছি, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও ভাগ্যে জুটেছে। নাটকে অর্থলাভ হয়নি, কিন্তু তার জন্যে কোন খেদ নেই। নাটক থেকে যে তৃপ্তি লাভ করেছি, তার কোন অর্থমূল্য হয় না। পাশাপাশি অনেকেই আছেন যাঁরা নাটক করেন অর্থের জন্যে, খ্যাতির জন্যে। তাঁদের উদ্দেশ্যকেও আমি ছোট করে দেখি না।

এবার শেষের প্রশ্নে আসি। দর্শক কেন নাটক দেখেন? প্রধানত দর্শক থিয়েটারে আসেন বিনোদনের জন্যে। উপরি পাওনা হিসেবে এর সাথে যুক্ত হয় শিক্ষা, সচেতনতা, সমাজভাবনা ইত্যাদি। যে কথা একজন দর্শক নিজে উচ্চকণ্ঠে বলতে পারেন না, নাটকের পাত্র-পাত্রীদের মুখে সেসব কথা উচ্চারিত হতে দেখলে তিনি খুশি হন। কর্তৃত্ববাদী সমাজে অনেক সময়েই যথার্থ কথাটি বলা যায় না, কিন্তু নাটক সহজেই সেসব বিষয় তুলে আনে। সমাজের অন্ধকার দিকে আলো ফেলে। তাই দর্শক মঞ্চে আপন ভাবনার প্রতিবিম্ব দেখতে পান। তাছাড়া সামনাসামনি বসে জীবন্ত মানুষের অভিনয় দেখার আনন্দই আলাদা। সেখানে যদি জনপ্রিয় ও খ্যাতিমান কোন শিল্পী থাকেন তবে তো কথাই নেই।

বাংলাদেশের নবনাট্যচর্চা আমাদের স্বাধীনতার সমানবয়সী। ১৯৭১ এর আগে আমাদের এখানে মঞ্চনাটক হয় নি যে এমন নয়। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে নাটকের কোন চর্চা হয় নি। বৃটিশ আমলে কলকাতার অনুকরণে ঢাকাতে কিছু বাণিজ্যিক থিয়েটার গড়ে উঠলেও, পাকিস্তান আমলে বাঙালি সংস্কৃতি, বিশেষ করে নাটককে নিরুৎসাহিত এবং অনেক ক্ষেত্রে বাধা প্রদান করা হত। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল। নাট্যকর্মীরা এ সুযোগটি পুরোপুরি গ্রহণ করে সূচনা করল নবনাট্যচর্চার ধারা। প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তখন গ্রুপ থিয়েটার চর্চা তুঙ্গে। সেটাও আমাদের নাট্যকর্মীদের উৎসাহিত করল আমাদের দেশে নিয়মিত নাট্যচর্চা শুরু করতে।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, আমাদের নাট্যদলগুলোকে আমরা অভিহিত করি গ্রুপ থিয়েটার হিসেবে। আমরা কিছু নাট্যামোদী সমমনা মানুষ একত্রিত হয়ে একটা নাটকের দল গঠন করি যারা অবাণিজ্যিক ভিত্তিতে ভাল নাটক ভালভাবে মঞ্চস্থ করতে চাই। আমার জানামতে আমাদের এই উপমহাদেশের বাইরে আমাদের মতো গ্রুপ থিয়েটার চর্চা অনুপস্থিত। সেখানে মূলধারা পেশাদার থিয়েটার বা বাণিজ্যিক থিয়েটারের বাইরে বিভিন্ন কাঠামোতে বিকল্প থিয়েটার চর্চা হয়। নন-প্রফিট থিয়েটার, অ্যামেচার থিয়েটার, ফ্রিঞ্জ থিয়েটার, অফ্ ব্রডওয়ে, অফ্ অফ্ ব্রডওয়ে, কমিউনিটি থিয়েটার Ñ এ ধরনের নানা অভিধায় চিহ্নিত করা হয় এসব থিয়েটারকে। বিদেশিদের কাছে আমাদের থিয়েটারকে পরিচিত করাতে একটা কথা আমি প্রায়ই বলি যে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণে আমরা মঞ্চনাটকে পেশাদার হতে পারি না, কিন্তু পেশাদারি দক্ষতার সাথে আমরা নাটক করি। এটা আমাদের ভালোবাসার থিয়েটার, সামাজিক দায়বদ্ধতার থিয়েটার। তথাকথিত বাণিজ্যিক থিয়েটার নয়, বাংলাদেশ বা ভারতে এখন পর্যন্ত আমাদের এই গ্রুপ থিয়েটারই মূলধারার থিয়েটার। বিদেশ থেকে যখন নাটকের মানুষেরা আমাদের দেশে এসে আমাদের নাটক দেখেন এবং আমাদের গ্রুপ থিয়েটার চর্চা সম্পর্কে অবহিত হন, তখন তাঁরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান যে, কী করে এত হাজার হাজার নাট্যকর্মী কোনরকম টাকা পয়সা না পেয়ে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এভাবে নাটক নিয়ে মেতে থাকে।

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সময়ে সবচেয়ে গৌরবের ঘটনা আবার অপরিসীম ত্যাগ ও বেদনারও বটে। বাংলাদেশের এমন কোনো পরিবার কি খুঁজে পাওয়া যাবে যারা কোনো না-কোনোভাবে ১৯৭১ সালে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি? গোটা দেশের মানুষ একাত্ম হয়ে পরাধীনতা থেকে, পাকিস্তানি বর্বরতা থেকে মুক্ত হতে চেয়েছিল। ব্যতিক্রম ছিল কেবল মুষ্টিমেয় কিছু স্বাধীনতাবিরোধী বিকৃত মানসিকতার মানুষ। স্বাভাবিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ আমাদের নাটকে অনিবার্য হয়ে উঠল। প্রথমদিকে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মূল্যবোধের অবক্ষয় আর পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কর্মকা-, দেশে প্রশাসন থেকে গণমাধ্যমে- সর্বত্র যখন মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধীদের আস্ফালন, ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধু যখন নির্বাসিত, বিকৃত ইতিহাস গড়ার অপচেষ্টায় যখন রাষ্ট্রের সকল যন্ত্র সক্রিয় তখন মঞ্চ থেকে স্বাধীনতার চেতনার কথা, মূল্যবোধের কথা, সত্যিকারের ইতিহাসের কথা নির্ভয়ে উচ্চারিত হলো। স্বাভাবিকভাবে দেশের সাধারণ মানুষ এসব মঞ্চ নাটককে স্বাগত জানাল।

আমাদের সবচেয়ে বড় গর্ব আমাদের নাট্যকর্মীদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। এ দায় তারা স্বেচ্ছায় নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। কারণ, তারা বিশ্বাস করেন মানুষের জন্যই শিল্প। তাই তাদের আকাক্সক্ষা শোষণহীন, মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ একটি সমাজ। সে সমাজ গঠনে সহায়ক শক্তি হিসাবে তারা কাজ করতে চান। সকল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করতে চান। সে-লড়াই শিল্পের লড়াই, সমাজে মানবিকতাবোধ আবার জাগিয়ে তোলার লড়াই। অনেক সময় শিল্পের মাধ্যমে অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ যথেষ্ট মনে হয় না; তখন রাজপথে নামতে হয়। সকলে মিলে একজোট হয়ে আন্দোলন করলে দুঃশাসনের অবসান হয়Ñবাংলাদেশের ইতিহাস এ সাক্ষ্যই দেয়।

নাট্যকর্মীদের এই জনসম্পৃক্ততা আমাদের নাটককে জনপ্রিয় হতে সাহায্য করেছে। সকল শিল্পের মূলে রয়েছে মানুষ- এ জীবনবোধ আমাদের সংস্কৃতি-কর্মীদের মধ্যে কাজ করে। নাটকের মধ্যে তা আরও বেশি। কারণ জনগণের কাছ থেকে দূরে বসে একাকী হয়তো কাব্যচর্চা করা যায়, ছবি আঁকা যায়; কিন্তু নাটক করা যায় না। নাটক একদিকে যেমন একটা যৌথ শিল্প, অন্যদিকে জীবন্ত মানুষের সামনে অভিনীত হবার লক্ষ্যে সৃষ্ট শিল্প। বেশিরভাগ নাটকই রচিত হয় সমকালে সমসাময়িক মানুষের সামনে অভিনীত হবার জন্য। সে-কারণে আমাদের দেশের বেশিরভাগ মৌলিক নাটক আমাদের সমসাময়িক জীবনের হাসি-কান্না, আকাক্সক্ষা-বঞ্চনা, গৌরব-হতাশার কথা বলে। সমাজের অন্ধকার দিকে আমরা আলো ফেলি বারবার এ আশায় যে, দর্শক আবার নতুন করে বিষয়গুলো নিয়ে ভাববেন, প্রতিবিধানের পথ খুঁজে নেবেন। সমস্যার সমাধান দেওয়া নাটকের কাজ নয়, সমাধান দর্শক নিজেরাই খুঁজে বের করবেন, আমরা কেবল ইঙ্গিত দিতে পারি মাত্র। দর্শকের কল্পনা শক্তির ওপর আমরা ভরসা করি। সব সময় খেয়াল রাখতে হয় নাটক যেন রাজনৈতিক বক্তৃতা বা সামাজিক নীতিকথা না হয়ে ওঠে। বক্তব্যকে শিল্পসম্মতভাবে উপস্থাপনই কুশলী নাট্যকারের দায়িত্ব।

নাটকের ক্ষেত্রে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউট (আইটিআই)। ১৯৪৮ সালে ইউনেস্কোর উদ্যোগে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নাট্যকর্মীদের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে বিশ্বশান্তি নিশ্চিত করার লক্ষ নিয়ে আইটিআই প্রতিষ্ঠিত হয়। ১২টি দেশ মিলে যে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিল, তার কর্মকান্ড এখন প্রায় ১০০টি দেশে বিস্তৃত হয়েছে। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ আইটিআই-র সদস্যপদ লাভ করে যদিও আমাদের দেশে পেশাদার থিয়েটার নেই বলে সদস্যপদ পেতে অনেক বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ আইটিআই-র অন্যতম সক্রিয় কেন্দ্র হয়ে উঠে। আমরা বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সেমিনার ও নাট্যোৎসব আয়োজন করেছি, অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা করেছি। কেন্দ্রীয় আইটিআই-র দ্বিবার্ষিক প্রকাশনা ‘দ্য ওয়ার্লড অব থিয়েটার’ গ্রন্থ গত ২০ বছর ধরে আমরাই প্রকাশ করেছি। তারই স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা আইটিআই-র বিভিন্ন কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হয়ে কাজ করেছেন। বর্তমান আলোচকের সুযোগ হয়েছিল দুই মেয়াদে ছয় বছর আইটিআই-র বিশ্ব সভাপতির দায়িত্ব পালন করার। এটি বাংলাদেশের প্রাণবন্ত নাট্যচর্চারই স্বীকৃতি বলে আমি বিবেচনা করি।

অনেকেই জানতে কৌতুহলী বিশ্বনাট্যের প্রেক্ষিতে আমাদের নাটকের অবস্থান কোথায়। এর জবাব দেয়া শক্ত। প্রত্যেক দেশেই নিজস্ব সংস্কৃতির ঐতিহ্য ও সমসাময়িকতার প্রেক্ষাপটে নাটক অভিনীত হয়। বিদেশে অনেক ব্যয়বহুল প্রযোজনা দেখে আমাদের কাছে অর্থহীন মনে হয়েছে। কিন্তু তাদের বিবেচনায় নিশ্চয়ই প্রযোজনাটির একটি কার্যকারণ রয়েছে। তবে সবদেশেই বাণিজ্যিক থিয়েটারের বাইরে বড়ো বড়ো ভালো থিয়েটার চলে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। যেমন ইংল্যান্ডে ন্যাশনাল থিয়েটার, বারবিকান সেন্টার, গ্লোব থিয়েটার বা রয়াল শেক্সপিয়ার কোম্পানীর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্টস কাউন্সিলের মাধ্যমে সরকার এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকে। তাদের বাজেটের ৮০ ভাগ আসে এসব অনুদান থেকে বাকি ২০ ভাগ টিকেট বিক্রি থেকে। জার্মানীর ন্যাশনাল থিয়েটারগুলোর ক্ষেত্রেও তাই। আমেরিকাতে অবশ্য ন্যাশনাল থিয়েটার নেই। যেমন নেই ভারতেও। বহু সংস্কৃতির দেশ বলে হয়তো ন্যাশনাল থিয়েটারের আদল কেমন হবে তা নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। ইরান বা চীনে বেশির ভাগ থিয়েটার চলে সরকারি অর্থানুকূল্যে, তবে সেসব জায়গায় কী ধরনের থিয়েটার হবে সে সম্পর্কে লিখিত-অলিখিত নিয়ন্ত্রণ আছে।

উত্তর মেরুর দেশ আইসল্যান্ডে ন্যাশনাল থিয়েটারের বয়স ৫০ পেরিয়ে গেছে। ওদের জনসংখ্যার চেয়ে বছরে টিকেট বিক্রি হয় আরও বেশি- তার অর্থ একজন দর্শক একাধিকবার থিয়েটারে নাটক দেখতে যান। ন্যাশনাল থিয়েটার বলতে সাধারণত আমাদের চোখে বড় বড় স্থাপনার কথা ভেসে আসে। কিন্তু আফ্রিকার সুদানে গিয়ে আমার সে ভ্রান্তি নিরসন হল। আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশেই ন্যাশনাল থিয়েটার হচ্ছে একটা সাদামাটা মঞ্চ, যার উপরে টিনের ছাউনি, দু’পাশে দুটো বড় ঘর। দর্শকের আসন মঞ্চের সামনে খোলা আকাশের নীচে। আরব দেশগুলো আজকাল নাটকের জন্যে অনেক আধুনিক স্থাপনা তৈরি করেছে, তবে সেখানে নিয়মিত নাট্যচর্চার কোন ধারা এখনও গড়ে ওঠেনি।

এই প্রেক্ষাপটে আমরা যে নাট্যচর্চা করি, তা খন্ডকালীন। পুরো সময়টা আমরা মঞ্চ নাটকে দিতে পারি না, কারণ এ থেকে জীবিকা নির্বাহ করা যায় না। তবে আমরা যদি সার্বক্ষণিক নাট্যকর্মী হতে পারতাম তবে হয়তো নাটকের মান অনেক উন্নত হত। এখানে একটা কথা বলে রাখি, উন্নত বিশ্বেও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা নাটকের স্কুল থেকে নাটক বিষয়ে শিক্ষা লাভ করে শতকরা ৮০ ভাগের বেশি ছাত্র-ছাত্রী থিয়েটারে সার্বক্ষণিক কাজের সুযোগ পায় না। আমাদের মতই ভিন্ন পেশা অবলম্বন করে জীবিকা নির্বাহ করে, তবে সুযোগ পেলেই নাটকে ঢুকে পড়ে। বিদেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রশিক্ষিত তরুণেরা নাটকের সাথে যুক্ত হয়। আমাদের দেশে আমরা কাজ করতে করতে শিখি। যাঁদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা আছে তাঁরা নবাগতদের শেখান। আজকাল অবশ্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাট্যকলার কোর্স শেষ করে ছেলেমেয়েরা বেরুচ্ছে। তবে তাদের কম সংখ্যকই মূলধারা থিয়েটারের সাথে যুক্ত হচ্ছে। কারিগরি ক্ষেত্রে স্বাভাবিক কারণেই আমাদের নাটক তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে আছে, কিন্তু বিষয়বস্তুতে বা অভিনয়ের স্বতঃস্ফূর্ততায় আমাদের নাটক বিশ্ব নাট্যাঙ্গনে নিজেদের পরিচিতি জানান দিতে পেরেছে।

মঞ্চ নাটকের ক্ষেত্রে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আমাদের দেশে অনুল্লেখ্য। আমাদের প্রকৃত পৃষ্ঠপোষক দর্শক। বাংলাদেশের নবনাট্যচর্চার যে বড় অর্জন ছিল দর্শক সৃষ্টি, তা এখন আমরা নানা কারণে হারাতে বসেছি। ঢাকা মহানগরীর কথাই ধরি। এখানে সিংহভাগ মানুষ আছেন যাঁরা জীবনে কোনদিন মঞ্চ নাটক দেখেন নি। কেবল একটি মাত্র পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে আমরা তাঁদের কাছে পৌঁছাতে পারি না। আজকাল ঢাকায় যে অসহনীয় যানজট তাতে মীরপুর বা উত্তরা থেকে দু’ঘন্টা দু’ঘন্টা চারঘন্টা সময় ব্যয় করে সেগুনবাগিচায় এসে দেড় দুই ঘন্টার নাটক দেখা রীতিমত দুঃসাধ্য। ভালো নাটকের সংবাদ তাঁদের কাছে পৌঁছুবার কোন মাধ্যম নেই। তারকাখ্যাতি অর্জন করেছেন, এমন বেশি শিল্পী মঞ্চে অভিনয় করেন না, তাই বাড়তি কোন আকর্ষণও নেই। এখন নিখরচায় টেলিভিশন, ইউ টিউব বা ওয়েবভিত্তিক কনটেন্ট থেকে যখন যেভাবে ইচ্ছা বিকল্প বিনোদনের দ্বার উন্মুক্ত।

পৃষ্ঠপোষকদের দৃষ্টিকোণ থেকে যদি বিবেচনা করি তবে দেখব পুঁজিবাদী সমাজে নিজস্ব প্রচার বা লাভ ছাড়া কেউ বিনিয়োগে উৎসাহী নয়। খেলায় পৃষ্ঠপোষকতা করলে প্রচুর প্রচার পাওয়া যায়, কিন্তু নাটকের দর্শক সীমিত বলে পৃষ্ঠপোষকরা আগ্রহী হন না। নাটককে আবার স্বাস্থ্য-শিক্ষার মত করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটির আওতায়ও গণ্য করেন না। কারণ সংস্কৃতিতে বিনিয়োগের ফল তাৎক্ষণিকভাবে চোখে দেখা যায় না। তবে কোন কোন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নাটকটাকে নিজেদের পণ্যের প্রচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চান, সেখানে কিন্তু নাটকের নিজস্ব লক্ষ্য ও আদর্শ বিচ্যুত হবার সমূহ সম্ভাবনা থাকে।

আমাদের থিয়েটারের এখন প্রধান সংকট দু’টি- দর্শকস্বল্পতা ও মানসম্পন্ন প্রযোজনার স্বল্পতা। মানবসম্পদ সৃষ্টিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে থিয়েটারের ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে হবে। দর্শক যাতে বৃদ্ধি পায় তার জন্যে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন প্রান্তে নাটক করার উপযোগী মঞ্চ তৈরি করতে হবে এবং প্রচারের নানা মাধ্যম খুঁজে বের করতে হবে যাতে নাটকের খবরটা মানুষের কাছে পৌঁছায়।

অর্থই যে কেবল আমাদের থিয়েটারকে বাঁচাতে পারবে Ñ এ কথা আমি বিশ্বাস করি না। এই মূহুর্তে যান্ত্রিক সভ্যতা আর মানব সভ্যতা মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। আর আমাদের দেশে আমরা এখনও প্রযুক্তি ব্যবহারে নবিশই বলা চলে। যেদিন এই প্রযুক্তিকে আমাদের পুরোপুরি জানা হয়ে যাবে, সেদিন আবার আমরা নিশ্চিতভাবেই ফিরে আসব প্রাণের কাছে। আর সে কারণেই, একজন শিল্পী মঞ্চে নাটক করে যে প্রাণের স্পর্শ পান, যে তৃপ্তি পান- অন্য কোন মাধ্যমে তা লাভ করা যায় না। আমাদের অতীত ঐতিহ্যের পথ ধরে অর্থকে প্রাধান্য না দিয়ে মানবিক জায়গা থেকে আমরা নিশ্চয়ই থিয়েটারকে অনন্য শিল্পমাধ্যম হিসেবে টিকিয়ে রাখতে পারি। বিশ্বে একটা অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারি।

এমন দিনের কল্পনা কি আমরা করতে পারি না যখন প্রতিটি প্রতিভাবান নাট্যজন ভাববেন- মঞ্চে নাটক না করলে আমার শিল্পীজীবন অসম্পূর্ণ; আর প্রতিটি দর্শক ভাববেন মঞ্চে নতুন নাটক না দেখলে আমার চিন্তার খোরাক জুটবে না, আমার সন্তানের রুচিবোধ তৈরি হবে না!

সকল হতাশাকে ঝেড়ে ফেলে যদি আমরা সত্যনিষ্ঠ হয়ে শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি, তবে নিশ্চয়ই সংকট কেটে যাবে। তার জন্যে প্রয়োজন ভালো নাটক ভালোভাবে করে যাওয়া- এর কোন বিকল্প নেই।

আর বেশি কিছু কী বলবার আছে, কেন নাটক?