Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

চত্বরের সমারোহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নামের পেছনের গল্প

কানিজ ফাতেমা

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ০২:১৪ পিএম, ৪ নভেম্বর ২০১৯ সোমবার

ছবি: মলরো বাগান   

ছবি: মলরো বাগান  

 

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস যেন অনেকগুলো চত্বরের সমন্বিত রুপ। এক চত্বর থেকে কয়েক কদম হাটলেই নিজেকে আবিষ্কার করতে হয় অন্য এক চত্বরে। কেউ প্রথমবার ক্যাম্পাসে আসলে এতো নামের চত্বর দেখে দ্বিধায় পড়ে যাওয়া যেন খুব ই স্বাভাবিক বিষয়।

মল চত্বর, হাকিম চত্বর, মিলন চত্বর, ডাস চত্বর, ভিসি চত্বর, দোয়েল চত্বর, সমাজবিজ্ঞান চত্বর প্রভৃতি নামের চত্বরের ছড়াছড়ি যেমন রয়েছে, তেমন রয়েছে এসব চত্বরের নামকরণের বিভিন্ন  ইতিহাস।

সবচাইতে বেশি গল্প প্রচলিত আছে মল চত্বরের নামকরণ নিয়ে। কেউ মনে করে ময়লা-আবর্জনা রাখার কারনে এটার নাম মল চত্বর, আবার কেউ কেউ মনে করে প্রচুর কাক  মলত্যাগ করার কারণেই এই চত্বরের নাম মল চত্বর। এমন আরো অনেক উদ্ভট গল্প প্রচলিত রয়েছে, তবে নামকরণের মূল ইতিহাস একেবারেই ভিন্ন।

 ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সাবেক ফরাসী সংস্কৃতি মন্ত্রী অঁদ্রে মলরোর  অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের সামনে একটি বাগানের নামকরণ করা হয় মলরো বাগান। তাই এই বাগানের পাশেই অবস্থিত চত্বরটির  নাম হয় মলরো চত্বর, যা লোকমুখে বিবর্তিত হয়ে মল চত্বরে রুপ নেয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী  সংলগ্ন  যে খোলা জায়গাটি রয়েছে, সেটি হাকিম চত্বর হিসেবে পরিচিত। বলা হয়ে থাকে, ১৯৬৭ সালে  আব্দুল হাকিম নামের ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর দোহার থেকে ঢাবি ক্যাম্পাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন জীবিকার তাগিদে। বর্তমান হাকিম চত্বর ষাটের দশকে ছিল ঝোপঝাড়ে  ভরা। সেখানেই একটি বড় আম গাছের নিচে বসে চা আর পান বিক্রি করতেন আব্দুল হাকিম। তখন থেকেই এই চত্বরটি হাকিম চত্বর নামে পরিচিত।

রাজু ভাস্কর্যের পাশে একটি ছোট এলাকাজুড়ে রয়েছে মিলন চত্বর। ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীর সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন ডাঃ শামসুল আলম খান মিলন। তার স্মরণে রাজু ভাস্কর্যের পাশেই “নিঝুম স্থাপত্য আজ মিলনের প্রতিবাদী  মুখ” ফলকে একটি স্থাপত্য নির্মাণ করা হয়।  তার নামানুসারেই চত্বরটির নামকরণ করা হয়েছে মিলন চত্বর।

টিএসসি ফটকের সামনে অপরাজিতা চা, মাল্টা চা, মরিচের চা, তেতুলের চা সহ বিভিন্ন ধরনের চা বিক্রি এবং আড্ডা দেয়ার জন্য জনপ্রিয় খোলা জায়গাটি পায়রা চত্বর নামে পরিচিত। শান্তির পায়রা ভাস্কর্যের নামানুসারেই চত্বরটি পায়রা চত্বর নামে পরিচিতি পায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বাধিক পরিচিত চত্বর হলো দোয়েল চত্বর। কার্জন হলের সামনে অবস্থিত বাংলাদেশের জাতীয় পাখি দোয়েলের স্মারক ভাস্কর্য- যার স্থপতি হলেন আজিজুল জলিল পাশা। এই ভাস্কর্যের নামেই চত্বরটি দোয়েল চত্বর নামে পরিচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবন- যা ভিসির বাংলো হিসেবে পরিচিত, তার সামনেই রয়েছে তিন দিক থেকে আসা সড়কের মোড়ে  একটি সড়কদ্বীপ। যেখানে চোখে পড়ে বিশাল জায়গা জুড়ে ডাল পালা মেলে রাখা দেড়শ বছরের পুরনো কড়ই গাছ আর গ্রানাইট পাথরের তৈরী ছোট বড় ১৪ টি স্তম্ভের সমন্বয়ে নির্মিত “স্মৃতি চিরন্তন”। মূলত চত্বরটি ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থিত বলেই ভিসি চত্বর নামে পরিচিত।

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সামনে মনোরম ফোয়ারা ঘিরে তৈরী করা হয়েছে কয়েক ধাপের বেদী। ক্লাসের ফাঁকে কিংবা লাইব্রেরী থেকে বের হয়ে কিছু সময়ের জন্য এই জায়গাটিতে সময় কাটানো কিংবা নাস্তা করা রোজকার চিত্র। সন্ধ্যার পর লাল-নীল আলোয় ফোয়ারার সৌন্দর্য যেন আরো কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সামনে অবস্থিত বলেই চত্বরটি সমাজবিজ্ঞান চত্বর নামে পরিচিত।

টিএসসির বিপরীতে ভাস্কর শামীম শিকদারের ‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’  ভাস্কর্যের সাথেই আছে ডাস ক্যান্টিন। নব্বই এর দশকে উত্তাল রাজনীতির সময়ে এই জায়গাটিতে প্রায়ই দখলকৃত হল নিয়ে দুই দলের মধ্যে সংগঠিত হতো বন্ধুকযুদ্ধ। মূলত ডাস ক্যান্টিনের কারণেই চত্বরটি ডাস চত্বর নামে পরিচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরের তালিকায় যুক্ত হওয়া সর্বশেষ চত্বরটি হলো কলাভবন চত্বর। পূর্বে কলাভবনের সামনের জায়গাটি অনেকের কাছেই বেওয়ারিশ চত্বর নামেই পরিচিত ছিলো। ২০১৭ সালেন নভেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদদের নামফলক স্থাপন এবং সৌন্দর্যবর্ধনের কার্যক্রম শুরু করে কর্তৃপক্ষ। কার্যক্রম শুরুর উদ্বোধনী ফলকে চত্বরটির নাম উল্লেখ করা হয় কলাভবন চত্বর হিসেবে।