Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

চেতনার আরেক নামঃ অপরাজেয় বাংলা

ফারজানা ফেরদ‌ৌসি

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ০৪:১৭ পিএম, ১৬ আগস্ট ২০১৭ বুধবার | আপডেট: ০৮:৫০ পিএম, ৩০ জুলাই ২০১৮ সোমবার

মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ঐতিহে্যর প্রতীক অপরাজেয় বাংলা  ছবি: ফারজানা ফেরদ‌ৌসি

মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ঐতিহে্যর প্রতীক অপরাজেয় বাংলা ছবি: ফারজানা ফেরদ‌ৌসি


ইতিহাস আজীবন কথা বলে। ইতিহাস মানুষকে ভাবায়, তাড়িত করে, প্রেরণার বাতিঘর হয়ে আলো ছড়ায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীন বাংলার গৌরবময়  ইতিহাস। স্বাধীন বাংলা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একই মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। দেশের শিক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের প্রতীক এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তাই ইতিহাস-ঐতিহ্যকে শিল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মিত হয়েছে অসংখ্যা ভাস্কর্য, যা কিনা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, স্বৈরাচারী আন্দোলনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব ঘটনার প্রতিফলন ঘটায়।

স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক ভাস্কর্যের কথা বললেই প্রথমে আমাদের চোখের সামনে যে দৃশ্যটি ভেসে উঠে তা হলো তিনটি নিশ্চল মূর্তি নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বললেও আমাদের মানসপটে ভেসে উঠে সেই একই ছবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন চত্বরে অবস্থিত এ ভাস্কর্যটির নাম “অপরাজেয় বাংলা”। কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে বাংলার নারী-পুরুষের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন এবং বিজয়ের প্রতীক এই ভাস্কর্য। এর নির্মাতা মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ। ভাস্কর্যটিতে তিনজন তরুণের মূর্তি প্রতীয়মাণ। এদের মধ্যে দুজন পুরুষ এবং একজন নারী। মূর্তির সর্ব ডানে রয়েছে কুচি দিয়ে শাড়ি পরিহিতা প্রত্যয়ী এক যোদ্ধা নারী সেবিকা। তারপাশে কাঁধে রাইফেলের বেল্ট ধরা, কাছা দেওয়া লুঙ্গি পরনে এক যুবক যার ডানহাতে একটি গ্রেনেড- তিনি বৃহত্তর গ্রাম-বাংলার জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। আর তার বামপাশে জিন্সপ্যান্ট পরা অপেক্ষাকৃত খর্বকায় তরুণ যার হাতে থ্রি-নট রাইফেল এবং চোখে-মুখে স্বাধীনতার দীপ্ত চেতনা।

১৯৭৩ সালে ভাস্কর্যটির কাজ শুরু হলেও তা শেষ হতে সময় লেগেছিল দীর্ঘ। রক্তক্ষয়ী পঁচাত্তরের পর দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ রাখা হয়েছিল ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ। পরবর্তীতে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ১৯৭৯ সালের জানুয়ারী মাসে পুনরায় ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ শুরু হয় এবং একই বছরের ১৬’ই ডিসেম্বর ভাস্কর্যটির উদ্বোধন করা হয়। ৬ ফুট বেদির উপর নির্মিত এ ভাস্কর্যটির উচ্চতা ১২ ফুট এবং প্রশস্থতা ৮ ফুট ।

ঐতিহ্যবাহী “অপরাজেয় বাংলা” ভাস্কর্য নির্মাণের ও রয়েছে ইতিহাস। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে, মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনন্য-সাধারণ অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে “ঢাকা বিশ্ববিয়াদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ” (ডাকসু) মনোযোগী হয়। এ জন্য বটতলা থেকে একটু দূরে  তৎকালীন শিল্পী আব্দুল লতিফের নকশায় নির্মিত হয় একটি ভাস্কর্য। কিন্তু রাতের আঁধারে একদল কুচক্রী মহল ভাস্কর্যটি ভেঙ্গে ফেলে। পরবর্তীতে সেখানেই আবার নতুন ভাস্কর্য নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ভাস্কর্য নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয় সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদের উপর। তিনি প্রথমে মাটি দিয়ে ভাস্কর্যের মডেল তৈরী করেন। মডেলটি সবার পছন্দ হলে ১৯৭৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে এর আনুষ্ঠানিক নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তখন থেকেই অক্লান্ত পরিশ্রম শুরু করে দেন খালিদ। তার আর দিন-রাত বলে কিছু থাকে নয়া। মানুষটার মগজে তখন একটাই চিন্তা ভাস্কর্য তৈরি। তবে কিছুদিন পরেই ঘটে যায় দেশের ইতিহাসের জঘন্যতম-অন্যতম কালো অধ্যায়। ১৯৭৫ সালের ১৫’ই আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা। তার কালো ছায়া থেকেও রেহাই পায়না ভাস্কর্য।  বিধ্বংসী একটা ট্যাংকের নল সবসময় অর্ধনিমিত তাক করে রাখা হত ভাস্কর্যের দিকে। তাছাড়া পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে পাকপন্থী এবং স্বাধীনতা বিরোধী চক্র গুলো ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলতে জনমত সৃষ্টির জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের স্বাক্ষর গ্রহন করে। কিন্ত তৎকালীন সব ছাত্র সংগঠনের নেতা কর্মী থেকে শুরু করে সাধারন শিক্ষার্থীরা তাদের এই পরিকল্পনাকে সমূলে নতসাত করে দিয়েছিল এবং তারা প্রবল বাধার স্মমুখীন হয়। ইসলামী শিবিরের কয়েকজন কর্মীকে চুন-কালি মেখে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরদিন নির্মাণাধীন অপরাজেয় বাংলার সামনেই বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পুলিশ ছাত্রশিবিরের পক্ষ নেয় এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালায়। হামলায় কতিপয় ছাত্র ও আহত হয়। তবে শেষপর্যন্ত  স্বাধীনতা বিরোধী স্বৈরাশাসকদের যতই পৃষ্ঠপোষকতা থাকুক না কেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অবিনাশী।
ভাস্কর্যটির নাম “অপরাজেয় বাংলা” হওয়ার কৃতিত্ব সে সময়ের “দৈনিক বাংলার” সাংবাদিক সালেহ চৌধুরীর। তিনি ভাস্কর্য নিয়ে সেসময় দৈনিক বাংলাতে একটি প্রতিবেদন লিখেছিলেন যার শিরোনাম ছিল “অপরাজেয় বাংলা”। পরবর্তীতে এ নামটিই সর্বসম্মতি ক্রমে গ্রহণ করা হয়।

“অপরাজেয় বাংলা” ভাস্কর্যটি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতীক, প্রেরণার উৎস এবং সকল আন্দোলনের প্লাটফর্ম হিসাবে কতটা যে গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝাতে মিশুক মনিরের খুব অসাধারণ একটি বক্তব্য অসামান্য- “ অপরাজেয় বাংলা দেশের মানুষের কাছে পৌঁছাতে কোন লিফ্লেটের দরকার পড়েনি। ছাত্র ইউনিয়ন,ছাত্রলীগ, বি.এন.পি হোয়াটেভার ইট ইজ, যাদেরই রাজনৈতিক কোন বক্তব্য রাখার প্রয়োজন হতো, কোথায় হবে? অপরাজেয় বাংলা। এই যে একটা ইউনিভার্সাল এক্সেপ্টেন্স এটা ৭৮,৮৫,৮৮ কনস্ট্যান্টলি হয়েছে। এরকম উদাহরণ হয়তো কমই আছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এক্রস দা প্লটফর্ম একই ভেন্যু,একই ইমেজ,একই ফিলিংস থেকে রিলেট করছে, গ্রেট এচিভমেন্ট”। মিশুক মনিরের এ বক্তব্যের সত্যতা আমরা আজও দেখতে পাই।

“অপরাজেয় বাংলা” ভাস্কর্যটিতে যে তিনজন মানুষকে দেখা যায় তাদের একজন হলেন ফার্স্টএইড বক্স হাতে একজন সেবিকা। যার মডেল হয়েছিলেন হাসিনা আহমেদ। তারই পাশে দাঁড়ানো সময়ের প্রয়োজনে রাইফেল কাঁধে তুলে নেওয়া গ্রীবা উঁচু করে ঋজু ভঙ্গিমায় গ্রামের টগবগে তরুণ। যার মডেল হয়েছিলেন সৈয়দ হামিদ মকসুদ। তিনি ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। এবং সবশেষে দাঁড়ানো দুহাতে রাইফেল ধরা  আরেক শহুরে তরুণ মুক্তিযোদ্ধা যার মডেল ছিলেন বদরুল আলম বেনু। তিনি শুধু অপরাজেয় বাংলার মডেলই ছিলেন না, তিনি ছিলেন আবদুল্লাহ খালিদের একান্ত সহযোদ্ধাও।

তবে দুঃখের বিষয় এইযে, সম্প্রতি সংস্কারের নামে ভাস্কর্যের প্রকৃত রুপ নষ্ট করে ফেলা নিঃসন্দেহে মর্মান্তিক। সাদা সিমেন্টের প্রলেপে ঢেকে দেওয়া ভাস্কর্যটির অবয়বে এতদিন গুঁড়ো পাথর ও সিমেন্টের মিশেলে মোজাইকের মতো যে টেকচার দেখা যেত তা পুরোপুরি ঢাকা পড়ে গেছে। যার কারণে ভাস্কর্যের মুক্তিযোদ্ধাদের দৈহিক গড়নের খোদাই করা ডিটেইল গুলাও অনেকটা ম্লান হয়ে পড়েছে। স্তরে স্তরে ঢালাইয়ের চিহ্ন বহনকারী বাঁক গুলোও মিশে গেছে। ফলে সাদা রঙয়ের ভাস্কর্যটি দেখতে এখন শোলার পুতুলের মত ওজনহীন মনে হয় এবং তার পরিচিত বলিষ্ঠতা ও গাম্ভীর্যতাও কমে গেছে। এই বিষয়ে কবি,সংগীত শিল্পী কফিল আহমেদ বলেছিলেন- “অপরাজেয় বাংলা আমাদের চেতনার সেই জাগ্রত শিল্প যা মানুষের সংগ্রামের প্রত্যয়ে সবসময় আমাদের জাগিয়ে রাখছে। যা কিনা এদেশের মানুষেরই মুক্তির প্রাণ মুখ। সেই মুখ ঢেকে দেওয়া কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায়না, সেই মুখ আমাদের চোখের সামনে স্পষ্ট থাকুক”।

ছাড়া ভাস্কর্য সংরক্ষনের বিষয় নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষার্থীরা। এদের মধ্যে উর্দু বিভাগের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নাইমা খাতুন বলেন “ঐতিহ্যবাহী এই ভাস্কর্য যেন এখন আড্ডা দেওয়ার জায়গা হিসাবে পরিণত হয়েছে। আর বাকিটা সময় কুকুরের আবাসস্থল। আমার মতে ভাস্কর্যকে টিকিয়ে রাখতে চাইলে সেটা ঘিরে দেওয়া উচিত”।

ইংরেজি বিভাগের নওরিন আহমেদ মনিষা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে “ অনেক বহিরাগত বা নিউ-কামার শিক্ষার্থীদের বলতে শুনি তিন মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এক্ষেত্রে অবশ্যই ভাস্কর্যের গায়ে ভাস্কর্যের নাম,পরিচয় যুক্ত থাকলে ভাল হত। তাছাড়া ভাস্কর্যের চতুর্দিক দিয়ে বিভিন্ন ইতিহাসের কথা লেখা থাকলে তা দিয়ে সহজেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আরো গভীরভাবে ফুটিয়ে তোলা যেত”

তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সদা জাগ্রত রাখতে ঐতিহ্যবাহী “অপরাজেয় বাংলা” ভাস্কর্যকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সকলকেই নিতে হবে।