Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডি: বেদনাঝঁরা সেই অক্টোবর

টিপু সুলতান

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ১২:৩৫ পিএম, ৪ নভেম্বর ২০১৯ সোমবার

১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর জগন্নাথ হলের ভবন ধসের ঘটনায় নিহতদের স্মরণে নির্মিত অক্টোবর স্মৃতি ভবন, ছবি: টিপু সুলতান

১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর জগন্নাথ হলের ভবন ধসের ঘটনায় নিহতদের স্মরণে নির্মিত অক্টোবর স্মৃতি ভবন, ছবি: টিপু সুলতান

১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর দিনটি ছিল মঙ্গলবার। বিটিভির পর্দায় চলছিলো মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘শুকতারা’। ১৫০ বছরের পুরনো জগন্নাথ হলের অনুদ্বৈপায়ন নামক ভবনের দোতলায় ছিল হলের টিভি কক্ষ। নাটকটি দেখার জন্য কক্ষটিতে হলের ছাত্র-কর্মচারী-অতিথিসহ ভিড় করেছিলেন প্রায় ৩০০ জন। আগে থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিল সেদিন। হঠাৎ বিকট শব্দে ছাদের মাঝের অংশ ভেঙে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ধুলায় অন্ধকার হয়ে যায় পুরো কক্ষ। ঘটনাস্থলেই মারা যান ৩৪ জন। পরে মারা যান আরও ছয়জন। তাদের মধ্যে ২৬ জন ছিলেন ছাত্র, কর্মচারী ও অতিথি ছিলেন ১৪ জন।

১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর এমনই এক হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে। সেদিন ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের মেধাবী শিক্ষার্থীদের লাশের স্তুপ দেখে পুরো দেশ শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছিল। এ ঘটনার পর থেকে দিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শোক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। নিহতদের স্মৃতি রক্ষার্থে পরবর্তী সময়ে এখানে নির্মিত হয় ‘অক্টোবর স্মৃতি ভবন’।

জানা যায়, বর্তমানে অক্টোবর স্মৃতি ভবনটি যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন বসতো। একে পরিষদ ভবন বা ‘এ্যাসেম্বলি হল’ বলা হত। ভবনটি ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকট হস্তান্তর করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভবনটিকে ছাত্রদের আবাসিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জগন্নাথ হলের সাথে যুক্ত করেন। পরবর্তীতে একাত্তরের শহীদ আবাসিক শিক্ষক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের নামে এর নামকরণ করা হয় ‘অনুদ্বৈপায়ন ভবন’।

এ ভবনটিতেই ছাত্রদের বিনোদনের ব্যবস্থা হিসেবে কর্তৃপক্ষ একটি বড় রঙিন টেলিভিশন স্থাপন করে। কক্ষের সামনের দিক, যেদিকটা নিচু ছিল সেখানেই রাখা ছিল টিভি। টিভির সামনের সমতল জায়গায় চৌকির মত রাখা ছিল। সেখানে বসতো ছোট ছেলে-মেয়েরা। আর তারপর থেকে পিছনের দিকে চেয়ার সাজানো ছিল। যেগুলোতে ছাত্রদেরই অগ্রাধিকার ছিল।

১৫ অক্টোবরের রাতটি ছিল খুবই দুর্যোগপূর্ণ, এ সময় বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট প্রবল নিম্ন চাপের কারণে মুষলধারে বৃষ্টি হয় এবং রাজধানী ঢাকার উপর দিয়ে প্রায় ১০০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়াসহ ঝড় বয়ে যায়। ভবনটির টিভি কক্ষের ছাদের খানিক ধ্বসে পূর্ব থেকেই বৃষ্টির পানি পড়ছিল। সেকারণে ভবনে মেরামতের কাজ চলছিল। ঐদিন রাত সাড়ে ৮টার সময় সেসময়ের জনপ্রিয় মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত ধারাবাহিক নাটক ‘শুকতারা’ প্রচার শুরু হয়। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে রঙিন টেলিভিশনে প্রিয় নাটক দেখার জন্য একে একে প্রায় ৩০০ জন ছাত্র ঐ ভবনে এসে টিভি দেখতে থাকে। অনেকে ভিতরে জায়গা না পেয়ে দরজার কাছে বা জানলার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল।

রাত প্রায় পৌনে ৯টার দিকে টিভি দর্শনরত ছাত্রদের উপর নেমে আসে মর্মান্তিক মৃত্যুর বিভীষিকা। মুহূর্তের মধ্যে বিকট শব্দে লোহার বিম, ইট, সুরকি মিলিয়ে প্রায় ৫০টন ওজনের ছাদ ধসে পড়ে তাদের উপর। সারারাত ধরে চলে উদ্ধারকার্য, কিন্তু ক্রেন এবং আনুষঙ্গিক যন্ত্রের অভাবে তাও ঠিকভাবে হচ্ছিল না।

রাত ১০টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের জরুরি বিভাগে আহতদের চিকিৎসাকার্য শুরু হয়। এ সময় মুমূর্ষু আহত রোগীদের জন্য প্রচুর রক্তের প্রয়োজন ছিল। ‘রক্তের প্রয়োজন’ এ ঘোষণার সাথে সাথে সবাই হাসপাতালে ছুটে যায় রক্ত দিতে। হাজার হাজার মানুষ সে সময়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসে উপস্থিত হয়েছিল সেবা-সাহায্যের জন্য। এমনকি সেদিন রিক্সাওয়ালারাও এ কার্যে কারো কাছ থেকে ভাড়া নেননি।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হলের কর্মচারী সুশীল কুমার দাস। তিনি ওই হলে এখনও চাকরিরত আছেন। ঘটনাক্রমে সেদিন এক ছাত্রকে সিট ছেড়ে দিয়ে সামনে গিয়ে বসায় সামান্য আঘাত প্রাপ্ত হয়ে প্রাণে বেঁচে যান তিনি। বর্তমানে তিনি অক্টোবর স্মৃতি ভবনের নিচতলায় একটি ছোট দোকান চালান। তিনি বলেন, তার ছেড়ে আসা সিটে বসা এক ছাত্র সেদিন মারা গিয়েছিল।

ঘটনার পরের দিন সকালের অবস্থার কথা বর্ণনা করে হলের দ্বার প্রহরী বিমল চন্দ্র রায় বলেন, হলের মাঠে সারি বেঁধে লাশগুলো রাখা হয়েছিল। নিহতদের আত্মীয়-স্বজনের আহাজারিতে হলের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠেছিল। পুরো ক্যাম্পাস হয়ে পড়েছিলো নিঃস্তব্ধ। মানুষের এতো ভিড় হয়েছিল যে পুলিশ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছে তাদের। ।

সেই ঘটনায় নিহতদের স্মরণে অক্টোবর স্মৃতিভবনের নিচতলায় একটি ছোট জাদুঘর রয়েছে। সেদিনের ব্যবহৃত টিভি রাখা আছে এই জাদুঘরে। মৃত্যুবরণ করা বেশ কয়েকজনের ছবিও আছে সেখানে। এছাড়া ভবনটির সামনে নিহতদের স্মরণে তাদের নাম সম্বলিত একটি নামফলকও স্থাপন করা হয়েছে।