Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

জীবন থেকে নেয়া

রনি, ফজলুর, শ্রাবণী, সাইরুল ও রবিউল

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ০১:০৫ পিএম, ১৯ নভেম্বর ২০১৮ সোমবার | আপডেট: ০১:৫৫ পিএম, ২১ নভেম্বর ২০১৮ বুধবার

জীবন থেকে নেয়া

জীবন থেকে নেয়া

কলা ভবনের সামনের বটতলা। বটের ছায়ায় বসে আছে মানুষ। চোখে পড়ে ছোট ছোট পায়ে ঘাস মাড়িয়ে আসা মাথায় আঁশের মতো লেগে থাকা চুল। শুকনো মুখে টলটলে চোখ। ময়লায় ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া জামা। খালি পায়ে হেলে-দুলে এসে মাথা এক পাশে কাঁত করে জিজ্ঞেস করে, ‘ও ভাই একটা ফুল নেন’। কেউ নেয়, কেউ নেয় না। না নিলে মায়া ভরা চোখে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। ফুল না বেঁচে যাবে না সে। দু-কথা বলেই সরিয়ে দেয়া যায় না। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। বিরক্তিতে কেউ কেউ আবার গায়ে ফেলে সরিয়ে দেয়। চলে যায় অন্য আরেক জনের কাছে।

সেখান থেকে দুপুরের খাবার। বিজয় একাত্তর হল। এঁটে করে রাখা প্লেট আর টেবিলের ময়লা মুছে দিচ্ছে নয় বছরের শামীম। শামীমের ডাক পড়ে অন্য টেবিল থেকে, ‘এটা কি মুছছিস? ভালো করে মুছ।’ শামীম তার হাতের ভেজা গন্ধ ভরা কাপড় দিয়ে চোখ নামিয়ে মুছে দেয়।

এরপর টিএসসি। গায়ের কাছে ছুটে আসে সাকিব, সাবিনা, বৈশাখীরা। চকলেট সাধে টাকার বিনিময়ে। চায়ের দোকানে চা টেনে দেয় আজাদ। চারুকলায় মালা বিক্রি করে জীবন।

এরকম আরো কয়েক জনকে চোখে পড়বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। আলমগীর, ১৩/১৪ বছর বয়সী এক কিশোর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হলের ক্যান্টিনে ৩ বছর ধরে কাজ করছে। চাঁদপুর থেকে ২০১৫ সালে এক প্রতিবেশীর সাথে ঢাকায় আসে আলমগীর। তখন থেকেই এই ক্যান্টিনে বয় হিসেবে কাজ করছে সে। বেতন মাসে ৩০০০ টাকা, সাথে খাবার, আর রাতে ক্যান্টিনেই ঘুমাতে হয়।

 

আলমগীরের বাবা তার মাকে রেখে বিয়ে করে অন্য আরেক জনকে, তাই মাস শেষে আলমগীর যা বেতন পায় তা মাকে পাঠাতে হয়।শুধু আলমগীর নয় এই ক্যান্টিনে তার মতো আরো ৭ জন বয় রয়েছে যাদের বয়স ৮ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে।

চাঁদপুরের কচুয়ার ছেলে পারভেজ। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়েই তার কপালে আর পড়াশুনা জোটেনি। পরিবারের অভাবের তাড়নায় জীবনের এই স্বপ্ন পূরণ হয়নি তার। তার খুব ইচ্ছে ছিল পড়াশুনা করে অনেক টাকা ইনকাম করবে।তবে আপাতত তার উপার্জনের গন্ডী কবি জসীম উদ্দীন হলের ক্যান্টিনেই সীমাবব্ধ।মাত্র ২ হাজার টাকা মাসে তাকে দেয়া হয়। দুই হাজার টাকার জন্য নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটি এখন ও অধরাই রয়ে গেলো তার। হল ক্যান্টিনের সবচেয়ে কম বয়সী এই ছেলেকে সবাই ডাকে `পিচ্চি` বলে। ক্যান্টিনের টেবিল পরিষ্কার করতে একটু দেরী হলে শুনতে হয় ধমক। গালিগালাজ ও কম শুনতে হয় না তাকে। এক টেবিল পরিষ্কার করে আরেকটা করতে যেতে একটু সময় লাগেই। এটি তার ছোট মাথায় সহজেই ধরতে পারে। কিন্তু সে বুঝেনা এত বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে তারা এটি বুঝেনা কেনো। তার লেখাপড়া করার খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু সে সুযোগ কি আদৌ আছে তার? হয়ত অবচেতন মনে সেসবেরই উত্তর খোঁজে পারভেজ । কিন্তু না, সদুত্তর না পেয়ে আবার কাজে মন দিতে বাধ্য হয় সে।

আল আমিনের বয়স সবে মাত্র ১০। বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। কয়েক বছর আগে তার বাবার মৃত্যুতে তাদের সাজানো সংসার যেন একেবারেই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। তার মা পরের বাড়িতে কাজ করে দুবেলা দু’মুঠো খাবার জুটবে এই আশায়। ওর মা মনে করে আল আমিনকে কোনো মুদি দোকান বা হোটেলে কাজ করতে দিলে তাদের ৪ জনের সংসারে দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের যোগাড় হয়ে যাবে। তাই কপালের ফেরে আজ আল-আমিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের ক্যান্টিনে কাজ করে।

এতো গেল কয়েকটি হলের চিত্র।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা হলের চিত্র একই। মুজুরী কম দিতে হয় বলে মালিকরা এই বয়সী ছেলেরে দোকানে কর্মচারী হিসেবে রাখার আগ্রহ দেখায়। এছাড়াও ক্যাম্পাসে বের হলেই দেখা মেলে এমন অনেক ছেলে মেয়েদের যারা ফুল, চকলেট ইত্যাদি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে ।

এ বিষয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রভাষক মো. গোলাম সারওয়ারের সাথে। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের এ শিশুরা অবশ্যই শিশুশ্রমের শিকার হচ্ছে। এ ব্যাপারে স্পষ্ট আইনানুগ ব্যবস্থা রয়েছে। সর্বশেষ সংশোধিত শিশুশ্রম আইন অনুযায়ী অভিযুক্তদের ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

আলমগীরের মতো এমন হাজারও শ্রমজীবী শিশুদের ভাগ্য কতটুকু পরিবর্তন হয়েছে অথবা পরিবর্তনের কোন চেষ্টা আদৌ করা হয়েছে কিনা তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যত একথা শুধু মুখে না বলে তা হৃদয়ে ধারণ করা এবং সে ভবিষ্যত যেন ভাল হয় সে লক্ষ্যে কাজ করলেই জাতির একটি উজ্জল ভবিষ্যত নিশ্চিত হবে।

আইন রয়েছে, রয়েছে আজও মানবতার আবেদন। কিন্তু আইনের যথাযথ প্রয়োগ হবে কখন সে দিকেই হয়ত চেয়ে আছে হাজার আলমগীর, পারভেজ, আল-আমিনদের পুষে রাখা স্বপ্ন। সে স্বপ্ন আদৌ বাস্তবায়িত হবে কিনা তারা নিজেরাও জানে না, তাদের জানার কথাও নয়।