Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

জ্ঞান ও সংস্কৃতিচর্চার মিলনস্থল এমসিজে সেমিনার লাইব্রেরি

সঞ্জয় বসাক পার্থ

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ০৬:৪৩ পিএম, ৭ নভেম্বর ২০১৭ মঙ্গলবার | আপডেট: ০৯:১০ পিএম, ৮ নভেম্বর ২০১৭ বুধবার

সেমিনার লাইব্রেরির বইয়ের একাংশ

সেমিনার লাইব্রেরির বইয়ের একাংশ

সকাল ১০ টায় একটা ক্লাসের পর আবার সেই বিকেল ৩.৩০ এ আরেকটা ক্লাস গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী দায়েদ ও সায়েমের। মাঝের এই অখণ্ড অবসর কিভাবে কাটাবেন দুই বন্ধু? দুজনেরই একযোগে উত্তর, “কেন, সেমিনার লাইব্রেরি আছে না! ওখানে বসে অ্যাকাডেমিক রিসার্চের কাজ করতে করতেই সময় কখন কেটে যাবে কেউই টের পাব না”।

শুধু দায়েদ কিংবা সায়েম নন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের (এমসিজে) বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরই সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা এই সেমিনার লাইব্রেরি। ক্লাসের নোট জোগাড়ের জন্য হোক, কিংবা প্রয়োজনীয় বই নেয়ার জন্য, সেমিনার লাইব্রেরি ছাড়া যেন বিভাগের শিক্ষার্থীদের একটি দিনও কাটে না।

১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কিছু সময় পরেই গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে চালু করা হয় এই সেমিনার লাইব্রেরিটি। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বিভাগের শিক্ষার্থী শহীদ সাংবাদিক সৈয়দ নাজমুল হকের সম্মানার্থে সেমিনার লাইব্রেরিটির নামকরণ করা হয়েছে ‘শহীদ সাংবাদিক সৈয়দ নাজমুল হক স্মৃতি পাঠাগার’।

রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার সপ্তাহে এই পাঁচদিন সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকে লাইব্রেরিটি। স্বল্প পরিসরে গড়ে ওঠা লাইব্রেরিটিতে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় প্রায় ৬,৭০০ এরও বেশি দেশি-বিদেশী বই আছে। অ্যাকাডেমিক বইয়ের সংখ্যাই বেশি, তবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কিংবা সাহিত্যের বইয়ের সংখ্যাও কম নয়। এছাড়া দুই শতাধিক থিসিস পেপার ও শতাধিক জার্নালও আছে এই সেমিনার লাইব্রেরিতে।

সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের যেহেতু দেশ-বিদেশের খবর সম্পর্কে প্রতিনিয়তই খোঁজ রাখতে হয়, সে কারণে শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে প্রতিদিন ৬ টি বাংলা সংবাদপত্র ও ২ টি ইংরেজি সংবাদপত্রও রাখা হয় সেমিনার লাইব্রেরিতে। প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয়-আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলো তাই খুব সহজেই ক্লাসের ফাঁকে জেনে নিতে পারেন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।  

সেমিনার থেকে প্রত্যেক শিক্ষার্থীই প্রয়োজন মাফিক যেকোনো বই নিয়ে সেমিনারে বসেই পড়তে পারেন, প্রয়োজনে ক্যাম্পাসের দোকান থেকে ফটোকপিও করে নিতে পারেন। তবে বাসায় বই নিতে চাইলে নির্ধারিত সেমিনার কার্ড জমা রেখে বই নিতে হয়। শুধু যে শিক্ষার্থীরাই বই নেন তা কিন্তু নয়, প্রয়োজনে বিভাগের যেকোনো শিক্ষকও সেমিনার লাইব্রেরি থেকে বই সংগ্রহ করতে পারেন।

লাইব্রেরির বেশিরভাগ বই বিভাগের অর্থায়নে কেনা। বিভাগের বার্ষিক বাজেটে সেমিনার লাইব্রেরির জন্য প্রতিবছর যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়, তা দিয়েই প্রয়োজনীয় বই কেনা হয়। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি থেকেও বিভাগীয় সেমিনারকে বই সরবরাহ করা হয়। চাহিদা অনুযায়ী বইয়ের তালিকা পাঠিয়ে দিলে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি থেকে বই বরাদ্দ করা হয় সেমিনারের জন্য। এছাড়া এশিয়াটিক ফাউন্ডেশন ও ব্যক্তিগত উদ্যোগেও অনেকে বই দিয়ে থাকেন সেমিনারে।

শুধু যে পড়াশোনাই হয় তা কিন্তু নয়, বিভাগের এই সেমিনার লাইব্রেরি বিভাগের অনেক সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডেরও প্রাণকেন্দ্র। প্রতিবছর বিভাগীয় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার সময় প্রথম বর্ষ থেকে শুরু করে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী সকলেই সমবেত হন এখানে, শিক্ষকদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় গান, কবিতা আবৃত্তি, উপস্থিত বক্তৃতা, নির্ধারিত বক্তৃতা সহ নানা ইভেন্ট। আগ্রহী শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে দাবা খেলায়ও অংশগ্রহণ করে থাকেন এখানে।  

প্রতিদিন শতাধিক শিক্ষার্থীর আগমন যেই সেমিনারে, সেটি দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে যত্ন ও নিষ্ঠার সাথে দেখভাল করে আসছেন জনাব রেজাউল ইসলাম আকন্দ, সকলের কাছে যিনি ‘রেজা ভাই’ নামেই সুপরিচিত। সেমিনারের কোন কোণায় কোন বই আছে, তা যেন একেবারে নখদর্পণে তাঁর। সারা বছর যখনই কোন বইয়ের দরকার হয়, শিক্ষার্থীরা বিনা দ্বিধায় হাজির হয় রেজা ভাইয়ের কাছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শারমিন জাহান জুহা বলেন, “রেজা ভাই ছাড়া আসলেই আমাদের অনেক বই খুঁজে পাওয়া সম্ভব হত না। যখনই কোন বই চেয়েছি, উনি সেটা জোগাড় করে রেখেছেন। তৎক্ষণাৎ দিতে না পারলেও বইয়ের নাম মনে রেখে পরে ঠিকই খুঁজে বের করে দিয়েছেন সেই বই। সাধারণ শিক্ষার্থীদের চাহিদার প্রতি খুব যত্নশীল উনি”।  

তবে প্রিয় সেমিনার লাইব্রেরি নিয়ে অনেক শিক্ষার্থীরই আক্ষেপের জায়গা একটাই, এখানকার বেশিরভাগ বইগুলোই পুরোনো ভার্শনের। চাহিদার তুলনায়ও বইয়ের কপিও যথেষ্ট নয়। এই বিষয়ে জানতে চাইলে রেজাউল ইসলাম আকন্দ বলেন, “নতুন বই দরকার সেটা আমরাও উপলব্ধি করেছি। কিন্তু প্রতি বছর সেমিনার লাইব্রেরির জন্য যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়, তা দিয়ে এত নতুন বই সংগ্রহ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না সবসময়। তারপরেও শিক্ষার্থীদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে যথাসম্ভব নতুন বই রাখার চেষ্টা করা হয়”।