Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

দুঃসহ সেই অক্টোবর!

সাইয়েদুজ্জামান

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ০২:১৩ পিএম, ১৬ অক্টোবর ২০১৭ সোমবার

অক্টোবর স্মৃতিভবন। ছবি:সাইয়েদুজ্জামান

অক্টোবর স্মৃতিভবন। ছবি:সাইয়েদুজ্জামান

১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর। দিনটি ছিল শুক্রবার। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে ঘটেছিল ইতিহাসের এক মর্মান্তিক ঘটনা। বিটিভিতে প্রচারিত সাপ্তাহিক ধারাবাহিক নাটক ‘শুকতারা’ দেখতে এসে সেদিন ধসেপড়া ছাদের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান জগন্নাথ হলের ৩৮ ছাত্র-কর্মচারী-অতিথি। পরে তাদের উদ্ধার ও সেবা করতে গিয়ে আরো দু’জন মারা যান। এ ঘটনার পর থেকে দিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শোক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এই ঘটনায় নিহতদের স্মৃতি রক্ষাতে পরবর্তী সময়ে এখানে নির্মিত হয় অক্টোবর স্মৃতিভবন।

ধসে যাওয়া ভবনটির দু’তলায় ছিল হলের টিভি কক্ষ। সে সময় ‘শুকতারা’ নামে ধারাবাহিক নাটক চলত বিটিভিতে। ‘শুকতারা’ নাটক দেখার জন্য তখন হলের ছাত্র, কর্মচারী, অতিথি ও আশপাশের বাইরের লোকজন ভিড় করতেন। টিভি কক্ষে সেদিন উপস্থিত ছিলেন প্রায় ২৫০-৩০০ জন। ভবনটির টিভি কক্ষের ছাদ ধসে পূর্ব থেকেই বৃষ্টির পানি পড়ছিল। সে কারণে ভবনে মেরামতের কাজ চলছিল। টিভি দেখার একপর্যায়ে হঠাৎ এক বিকট শব্দে ছাদের মাঝের অংশটুকু ভেঙে পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান ৩৮ জন। পরে আরো ২ জন মারা যান।

ওই ভবনটি ছিল প্রাদেশিক পরিষদের সংসদ ভবন। কক্ষের সামনের দিক, যেদিকটা নিচু ছিল সেখানেই রাখা ছিল টিভি। টিভির সামনের সমতল জায়গায় চৌকির মতো রাখা ছিল। সেখানে বসত ছোট ছেলেমেয়েরা। আর তারপর থেকে পেছনের দিকে চেয়ার সাজানো ছিল। যেগুলোতে ছাত্রদেরই অগ্রাধিকার ছিল।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হলের কর্মচারী সুশীল দাস। তিনি এখনো চাকরিরত আছেন। ঘটনাক্রমে সেদিন এক ছাত্রকে সিট ছেড়ে দিয়ে সামনে গিয়ে বসায় সামান্য আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে প্রাণে বেঁচে যান তিনি। বর্তমানে তিনি অক্টোবর স্মৃতিভবনের নিচতলায় একটি ছোট দোকান চালান। তিনি বলেন, আমার ছেড়ে আসা সিটে বসা এক ছাত্র সেদিন মারা গিয়েছিল। আমি ওখানে বসা থাকলে হয়তো আজ আর বেঁচে থাকতাম না। আমি চেয়ারে বসা ছিলাম। এক ছাত্র এলে আমি চেয়ার ছেড়ে তাকে দিয়ে সামনে চৌকিতে গিয়ে বসি। এর মিনিট খানেকের মধ্যেই হঠাৎ এক বিকট শব্দে ছাদ ভেঙে পড়ে। পুরো টিভি কক্ষ ধুলোয় অন্ধকার হয়ে যায়। এরপর আর কিছু বলতে পারি না।

ঘটনার পরের দিন সকালের অবস্থার কথা বর্ণনা করে হলের দ্বারপ্রহরী বিমল চন্দ্র রায় বলেন, হলের মাঠে সারি বেঁধে লাশগুলো রাখা হয়েছিল। নিহতদের আত্মীয়স্বজনের আহাজারিতে হলের পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছিল। পুরো ক্যাম্পাস নিঃস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। মানুষের এত ভিড় হয়েছিল যে, পুলিশ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছে তাদের। আহতদের স্বেচ্ছায় রক্ত দেয়ার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন সর্বস্তরের মানুষ। এমনকি মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার জন্য রিকশাচালকরাও ভাড়া চাইতেন না।

ওই সময় হলের টিভি রুমের দায়িত্বে ছিলেন সুশীল কুমার দাশ। তিনি এখন হলের প্রাধ্যক্ষের বাসায় কাজ করেন। তিনি বলেন, ওইদিন টিভিতে ‘শুকতারা’ নাটক দেখার জন্য ছাত্ররা টিভি রুমে আসে। আমি টিভি চালিয়ে দিয়েছিলাম। ছাত্ররা টিভিতে নাটক দেখছিল। টিভি দেখাকালীন হঠাৎ একটা বিকট আওয়াজে ছাদের মাঝখানের অংশ ধসে পড়ে। তারপরের সবকিছুই সবার জানা। তিনি বলেন, তখন এই বিল্ডিংটির মেরামত কাজ চলছিল। বিল্ডিংয়ের ছাদ বৃষ্টির পানিতে নরম হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারপরও ছাত্ররা ঝুঁকি নিয়ে এই রুম ব্যবহার করত।

উল্লেখ্য, সেই ঘটনায় নিহতদের স্মরণে অক্টোবর স্মৃতিভবনের নিচতলায় একটি ছোট জাদুঘর আছে। সেদিনের ব্যবহৃত টিভি রাখা আছে এই জাদুঘরে। মৃত্যুবরণ করা বেশ কয়েকজনের ছবিও আছে সেখানে। এ ছাড়া ভবনটির সামনে নিহতদের স্মরণে তাদের নাম সম্বলিত একটি নামফলক স্থাপন করা হয়েছে।