Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

দেয়াল যখন প্রতিবাদ মঞ্চ

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ১২:০৭ পিএম, ২৮ অক্টোবর ২০১৯ সোমবার | আপডেট: ০৪:২২ এএম, ৫ জানুয়ারি ২০২০ রবিবার

দেয়াল যখন প্রতিবাদ মঞ্চ

দেয়াল যখন প্রতিবাদ মঞ্চ

আবরার ফাহাদ। গত ৭ অক্টোবর রাতে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের শেরে বাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে। তার সহপাঠীদের অভিযোগ এবং এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে মনে করা হচ্ছে ফেসবুকে ভিন্নমত পোষণ করা কাল হয়েছিল আবরারের জন্য। কিন্তু এরপর্ ফুঁসে ওঠে বুয়েট। যে বুয়েটে ভিন্নমত প্রকাশের জন্য প্রাণ দিতে হয় আবরারকে, সে বুয়েট হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের জোরালো মত প্রকাশের কেন্দ্রস্থল।দীর্ঘদিন ধরে চলমান র‌্যাগিং, রাজনৈতিক দমন পীড়ন এবং নোংরা রাজনীতির বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান জানান দেয় বুয়েটের শিক্ষার্থীরা। আর তাদের এ প্রতিবাদের অন্যতম ভাষা ছিল গ্রাফিতি বা দেয়াল লিখন।

আবরার হত্যার বিচার দাবিতে উত্তাল বুয়েটের দেয়াল হয়ে ওঠে প্রতিবাদের মঞ্চ। দেয়ালে দেয়ালে আগুন ঝরাতে থাকে বিভিন্ন প্রতিবাদী গ্রাফিতি। আবরারের পরিবারের কাছে বুয়েট শিক্ষার্থীদের ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমও হয়ে ওঠে দেয়াল। কান্নারত মায়ের মুখচ্ছবির পাশে উঠে এসেছে ‘সরি মা’। আবরারের বাবার কান্নাদৃশ্যের পাশে দাও দাও করে জ্বলছে সে তিক্ত প্রশ্ন ‘পারবেন আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিতে?’

আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার দাবিতে গড়ে ওঠা এ গ্রাফিতি প্রতিবাদ ভুলে যায়নি অতীত নৃশংসতাগুলোকেও। ২০০২ সালে টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে দু্ পক্ষের গোলাগুলিতে নিহত ছাত্রী সনি কিংবা ২০১৩ সালে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের হাতে কুপিয়ে হত্যার শিকার হওয়া আরিফ রায়হান দ্বীপ কেউ বাদ যায়নি গ্রাফিতির ক্যানভাস থেকে। বরং একটি প্রশ্ন এ গ্রাফিতিটি আমাদের সামনে রেখে যায়, ‘এরপর আপনি নন তো?’ কিন্তু এর জবাবও আবার পাওয়া যায় গ্রাফিতির মাঝে ‘হোক প্রতিবাদ’।

বুয়েটের মেকানিক্যাল ঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী প্রান্তজিত সরকার বলেন, “প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে আমরা গ্রাফিতিকে বেছে নিয়েছি। ক্যাম্পাসে মিছিল-স্লোগান তো আবরারকে বাঁচাতে পারলো না। গ্রাফিতিগুলো অন্তত ওর স্মৃতি অনেকদিন ক্যাম্পাসে ধরে রাখবে”। কেমিক্যাল ঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী সামিরা হোসেন বলেন, “এ ক্যাম্পাস আমাদের কারও জন্য নিরাপদ না। আমরা নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ক্যাম্পাস রেখে যেতে পারছি না। তবে এ গ্রাফিতিগুলো হয়তোবা কারও মনে দাগ ফেলবে। হয়তো অন্য কোন আবরার এরফলে বেঁচে যাবে।” সামিরা আরও জানান, গ্রাফিতি গুলোতে কেবল আবরার হত্যার বিচার দাবি করা হয়নি, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে তেমন বার্তা দেয়ারও চেষ্টা করা হয়েছে।

আবরার হত্যার পর বুয়েট ক্যাম্পাসে গড়ে ওঠা এ গ্রাফিতি আন্দোলন উদ্বুদ্ধ করেছে অন্যদেরও। বুয়েটের আন্দোলনের হাওয়া এসে লেগেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও। জেগে উঠেছে পুরনো ক্ষত। ক্যাম্পাসে লাশের মিছিল যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও বেশ দীর্ঘ। সিট দখলের রাজনীতিতে নিহত হওয়া ছাত্র আবু বকর, কিংবা শীতের রাতে বারান্দায় নিউমোনিয়ায় কাতরানো হাফিজুর মোল্লা হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতির বিষয়বস্তু।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থী এবং গ্রাফিতি শিল্পী জাহিদ জামিল বলেন, “বর্তমানে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে গ্রাফিতি খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আমরা শিল্পীরাও আমাদের ভাষাতে প্রতিবাদ করতে পারছি। শিক্ষার্থীদের মাঝে গঠনমূলক রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হয়ত সাহায্য করবে।”

গ্রাফিতিগুলোর রাজনৈতিক মূল্য বোঝাতে জাহিদ জামিল টেনে আনেন ১৯৬৮ সালের মে মাসে ফ্রান্সে সংগঠিত হওয়া ছাত্র বিপ্লবের প্রসঙ্গ।তিনি বলেন, “ঐ ছাত্র আন্দোলনেও কিন্তু প্রতিবাদের অন্যতম ভাষা ছিলো গ্রাফিতি। সে গ্রাফিতিগুলো আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে, হয়ত আজকেরগুলোও আগামী দিনের অনেককে করবে”।

এ শিল্পী আশা প্রকাশ করেন গ্রাফিতিগুলো শিক্ষারর্থীদের মনের প্রতিবাদী শক্তিতে আরও জাগ্রত করবে। “প্রতিবাদ ছাড়া আসলে অন্যায় কখনো থামেনি, থামবেও না। প্রত্যেককে নিজ নিজ জায়গা থেকে সাধ্যমত চেষ্টা করা উচিত।তাহলে হয়ত আমাদের আর কোন মায়ের কান্নার গ্রাফিতি আঁকার প্রয়োজন হবে না”। এমনটি প্রত্যাশা গ্রাফিতি শিল্পী জাহিদ জামিলের।