Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

বিশ টাকার রসনাবিলাসে অনন্য টিএসসি ক্যাফেটেরিয়া

ফারজানা তাসনিম পিংকি

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ০১:১৩ এএম, ৮ নভেম্বর ২০১৭ বুধবার | আপডেট: ০১:৩৪ এএম, ৮ নভেম্বর ২০১৭ বুধবার

বিশ টাকার রসনাবিলাসে অনন্য টিএসসি ক্যাফেটেরিয়া

বিশ টাকার রসনাবিলাসে অনন্য টিএসসি ক্যাফেটেরিয়া

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আড্ডার কেন্দ্রস্থল কোনটি- এই প্রশ্নের জবাবে চোখ বন্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তো বটেই, তরুণদের বেশির ভাগই বলবেন টিএসসির কথা। আড্ডা আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র বা টিএসসি শব্দ দুটি যেন একে অন্যের পরিপূরক। ইট-সুড়কির নগরী ঢাকায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেন একখণ্ড সবুজ চাদরে মোড়া উপত্যকা। আর এই উপত্যকার মধ্য দিয়ে ছুটে চলা উচ্ছ্বল ঝর্ণার নাম ‘টিএসসি চত্বর’। চতুর্দিকে নদীবেষ্টিত ঢাকা আজ কংক্রিটের নগরী। নগর জীবনের ক্লান্তি দূর করতে তাই বিভিন্ন শ্রেণী, পেশা আর বয়সের মানুষ প্রতিদিন ভিড় জমান টিএসসিতে। কিন্তু শুধু বাতাস খেয়ে তো আর পেট ভরে না! কাজেই মানসিক শান্তির পাশাপাশি ভোজনরসিক বাঙালির রসনাবিলাসের জন্য রয়েছে টিএসসির বিখ্যাত ক্যাফেটেরিয়া।

দুপুর বারোটার দিকে ক্যাফেটেরিয়ায় গেলে প্রায় শ’খানেক শিক্ষার্থীর দেখা মেলে, যারা দুপুরের খাবারের জন্য ঘণ্টাখানেক আগে থেকে টিএসসিতে এসে ভিড় করতে থাকে। একবারে একশো শিক্ষার্থীর বসার ব্যবস্থা থাকায় প্রায়শই খালি সিটের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের লম্বা লাইন দেখা যায়। একটু দেরি হলেই অপেক্ষা করতে হতে পারে আধ ঘণ্টার মতো। সেলফ সার্ভিস সিস্টেম চালু থাকায় টাকা দিয়ে স্লিপ নিয়ে টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ায় নিজের খাবার নিজেকেই গিয়ে নিয়ে আসতে হয়। হলের একঘেয়ে খাবার খেতে খেতে বিরক্ত হয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকেই রুচি বদলাতে চলে আসেন টিএসসিতে। স্ন্যাক ছাড়াও এখানে দুপুর এবং রাতের খাওয়ার ব্যবস্থা আছে।

ক্যাফেটেরিয়ার ইতিহাস বলতে গেলে অবধারিতভাবে চলে আসে টিএসসির ইতিহাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে আর ১৯৫৭ সালে অঙ্কুরিত হয় টিএসসি। টিএসসির পাথেয় হিসেবে ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। অঙ্কুরিত হয় কথাটি বলা হলো কারণ টিএসসির বীজ বপন করা হয়েছিল আরও আগে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই। এ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়ে একটি মিলন কেন্দ্র গড়ে ওঠে। ১৯৬১ সালে কার্জন হলের ক্ষুদ্র পরিসরে টিএসসি’র কর্মকাণ্ড শুরু হলেও ১৯৬৫ সালে বর্তমান টিএসসির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।

গ্রিসের বিশ্বখ্যাত নকশাকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডকসিয়াডিস অ্যাসোসিয়েটস’ কনসালট্যান্ট লিমিটেড এথেন্সের নকশা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী টিএসসি কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ শুরু করে। তৎকালীন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ও যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্ড ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহায়তায় এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৬৬ সালে। টিএসসির মূল কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৬৭-৬৮ সাল থেকে। টিএসসি এর পূর্ণরূপ ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (Teacher-Student Center)। অর্থাৎ ছাত্র-শিক্ষকদের মিলনমেলা। এর মাধ্যমে শিক্ষক-ছাত্রের মাঝে গড়ে ওঠে হৃদ্যতা। এখানে চলে চিন্তার পারস্পারিক ভাগ-বাটোয়ারা। ছাত্ররা অনেক সময় ক্লাসে শিক্ষকদের কঠিন কঠিন লেকচার জোর করে গলধঃকরণ করে নিলেও টিএসসির সবুজ চত্বরে বসে বন্ধুদের সঙ্গে, কখনোবা শিক্ষকদের সঙ্গেও আড্ডাচ্ছলে তার নির্যাসটুকু নিয়ে নেয়। টিএসসি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অব্যবহতি পরেই পেট পূজার তাগিদায় তৈরি করা হয় ক্যাফেটেরিয়া।

বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শিক্ষার্থীদের আনাগোনা শুরু হয় সকাল থেকেই। দুপুর এবং পড়ন্ত বিকালে তাদের কোলাহলপূর্ণ পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। কখনো পড়ালেখা নিয়ে আলাপ করতে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে অথবা কেবল অলস সময় কাটাতেই শিক্ষার্থীরা চলে আসে টিএসসিতে। এখানে বসে চলে হাসি-তামাশা, আড্ডা, গান, জন্মদিন পালন, ইফতার পার্টি, গ্রুপ স্টাডি, একাডেমিক আলোচনা আরো কত কী! প্রেমিক-প্রেমিকার মনের গহীন কোণে লুকানো সব কথা উজাড় করে বলতেও টিএসসির জুড়ি নেই। আড্ডা দিতে দিতে ক্ষুধা লেগে গেলে আছে টিএসসি’র ক্যাফেটেরিয়া।

শুক্র ও শনিবার বাদে বাকি পাঁচ দিন এ ক্যাফেটেরিয়া খোলা থাকে। প্রতি বেলা ২০ টাকার বিনিময়ে এখানে পাওয়া যায় ডাল, আলু ভর্তা, সাদা ভাত এবং পোলাও-বিরিয়ানির মতো অভিজাত খাবার। শিক্ষার্থীরা তিন টাকার শিঙাড়া আর এক টাকার চায়ের কাপে ঝড় তুলে ফেলে রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে। এখানে খাবারের গুণগত মান নয়, আড্ডা আর পরিমাণই মুখ্য।

ছোট্ট এ জায়গাটি কখনো কখনো প্রকম্পিত হয় প্রতিবাদের তুফানে। আবার কখনো সেখানে জমে ওঠে সংগীত আর কবিতার মিলনমেলা। শুধু বর্তমান শিক্ষার্থীরাই নয়, অগ্রজ ও প্রাক্তন অনেক শিক্ষার্থী কিংবা বহিরাগতদের অনেকেও টিএসসিতে ঘুরতে এসে একবার ক্যাফেটেরিয়ায় ঢুঁ মারতে ভোলেন না। তাছাড়া ইফতার পার্টি বা অন্য যেকোনো অনুষ্ঠানেও টিএসসি কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে ভাড়া দেয়া হয় ক্যাফেটেরিয়া। টিএসসির বিভিন্ন সংগঠনও তাদের প্রাত্যহিক নাস্তা বা ডাল-ভাতের ব্যবস্থা এখান থেকেই করে থাকে। ক্যাফেটেরিয়ার সব কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রায় ২০ জন কর্মচারী নিয়োজিত আছেন।

ক্যাফেটেরিয়ার ভেতরের বা সামনের প্রাত্যহিক আড্ডা, অনুষ্ঠানমালা শাণিত করে আমাদের প্রগতিকে। উজ্জীবিত করে আমাদের সংস্কৃতিকে। আর স্বপ্ন দেখায় আমাদের নতুন এক সূর্যোদয়ের। ক্যাফেটেরিয়া তাই তারুণ্যের এক উঠান, যে উঠানে বসে শিক্ষার্থীরা গেয়ে ওঠে-

পড়ন্ত বিকেল ক্যাফেটেরিয়া
উঁকি দিয়ে দেখি,
এক কাপ চা, গরম তৃষ্ণায়
অজস্র এলোমেলো শব্দের ভীড়ে

তোমার শীতল চোখ ভিজিয়ে যায় আমায়।