Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

মুক্তি-সংগ্রামের ইতিহাসের ধারক

তন্ময়, মুস্তাফিজ, তাহমিনা, খাইরুজ্জামান ও মহরম

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ০৩:০৭ পিএম, ১৯ নভেম্বর ২০১৮ সোমবার | আপডেট: ০৪:৩২ পিএম, ২২ নভেম্বর ২০১৮ বৃহস্পতিবার

স্বোপার্জিত স্বাধীনতা

স্বোপার্জিত স্বাধীনতা

`ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়` নামটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে। স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি ও শহীদদের স্মরণে নির্মিত অনেকগুলি ভাস্কর্য রয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা প্রান্তে। সেই সব ভাস্কর্যগুলোর আশেপাশে প্রতিদিন বিচরণ করছে শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষ। কিন্তু তারা কতটুকু বা জানেন এগুলোর ইতিহাস সম্পর্কে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, যে জাতি তার নিজের ইতিহাস জানে না, সে জাতি কখনো উন্নতি করতে পারে না। আর প্রতিটি ভাস্কর্যের সাথেই জড়িয়ে আছে ইতিহাস, জড়িয়ে আছে ঐতিহ্য।

 

স্বোপার্জিত স্বাধীনতা: 

মানুষের নিজ উপার্জিত জিনিসের প্রতি আগ্রহ থাকে সবচেয়ে বেশি। স্বোপার্জিত অর্থ হলো নিজেদের দ্বারা অর্জিত। ১৯৭১ সালে অর্জিত স্বাধীনতাও আমাদের নিজেদের দ্বারা অর্জিত গৌরব। আমাদের স্ব-অর্জিত স্বাধীনতাকে স্মরণ রাখতে টিএসসির চার রোডের সমন্বয় সড়কদ্বীপে নির্মাণ করা হয় এই দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্যটি। এটি রাস্তার মূল সমতল থেকে ১৩ ফুট উঁচু করে তৈরি করা একটি সিমেন্ট-বালু-রডের ভাস্কর্য। স্বাধীনতার ১৬ বছর পরে ১৯৮৭ সালে দেশখ্যাত ভাস্কর শামীম শিকদার এর নির্মাণ কাজ শুরু করেন যা ১৯৮৮ সালের ২৫ মার্চ তারিখে উদ্বোধন করা হয়।

 

স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্য চত্বর

স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্য চত্বর:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামে শহীদদের স্মরণে নির্মিত হয়েছে এই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটির স্থপতি শামীম শিকদার। এতে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন ধাপ-মহান ভাষা অন্দোলন, ৬৬ সালের স্বাধীকার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ, ২৫ মার্চের কালরাত্রি, ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা ও ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়ের চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে।

১৯৮৮ সালে ফুলার রোডে ভাস্কর্যটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ১০ বছর পরে ১৯৯৮ সালে ভাস্কর্যটিকে স্থানান্তর করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফুলার রোডে সলিমুল্লাহ হল, জগন্নাথ হল ও বুয়েট সংলগ্ন সড়কদ্বীপে। যার নাম বদলে দেওয়া হয় স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্য। ১৯৯৯ সালের ৭ মার্চ এ ভাস্কর্যটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শ্বেতবর্ণের স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্যে রয়েছে ১৮ জন শহীদের মুখাবয়ব, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ত্রিশ লাখ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলার পতাকা। উচ্চতায় ৭০ ফুট ও প্রায় ৮৬ ফুট চওড়া মূল ভাস্কর্যকে কেন্দ্র করে চারপাশে তৈরি করা হয়েছে দেশ-বিদেশের বুদ্ধিজীবীদের মোট ১১৬ টি ভাস্কর্য।

 

অপরাজেয় বাংলা 

অপরাজেয় বাংলা:

স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক ভাস্কর্যের কথা বললেই প্রথমে আমাদের চোখের সামনে যে দৃশ্যটি ভেসে উঠে তা হলো তিনটি নিশ্চল মূর্তি নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন চত্বরে অবস্থিত এ ভাস্কর্যটির নাম “অপরাজেয় বাংলা”। এর নির্মাতা মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ। ভাস্কর্যটিতে তিনজন তরুণ-তরুণীরর মূর্তি প্রতীয়মাণ। এখানে যে তিনজন মানুষকে দেখা যায় তাদের একজন হাসিনা আহমেদ। তারই পাশে দাঁড়ানো রাইফেল কাঁধে তরুণ সৈয়দ হামিদ মকসুদ এবং সবশেষে মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকায় দাঁড়ানো তরুণ হচ্ছেন বদরুল আলম বেনু।

রক্তক্ষয়ী পঁচাত্তরের পর দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ রাখা হয়েছিল ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ। পরবর্তীতে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ১৯৭৯ সালের জানুয়ারী মাসে পুনরায় ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ শুরু হয় এবং ১৬’ই ডিসেম্বরে ভাস্কর্যটি উদ্বোধন করা হয়। ৬ ফুট বেদির উপর নির্মিত এ ভাস্কর্যটির উচ্চতা ১২ ফুট এবং প্রশস্ততা ৮ ফুট।

এই ভাস্কর্য সম্পর্কে আরও বিস্তারিতভাবে পড়ুন চেতনার আরেক নামঃ অপরাজেয় বাংলা



১৯৯৫ সালে নির্মাণ কাজ চলাকালে স্মৃতি চিরন্তন (ডাকসু সংগ্রহশালা)

 

 

স্মৃতি চিরন্তন

স্মৃতি চিরন্তন:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের পশ্চিম পাশের নীলক্ষেত-ফুলার রোডের সংযোগ স্থলে ত্রিভুজ আকারে গঠিত সড়ক দ্বীপে অবস্থিত টেরাকোটা সংবলিত স্মারক নিদর্শন-স্মৃতি চিরন্তন (Memory Eternal)। ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে আত্মত্যাগ-তারই নিদর্শন স্বরূপ গ্রানাইট পাথরের তৈরি ছোট বড় ১৪ টি দেয়াল। বেদিতে ওঠার সময় কালো সিঁড়ির উভয় পাশে বাংলা ও ইংরেজিতে মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং বিজয়ের পরপরই রাজাকার-আলবদরদের হাতে নিহত হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর শহীদ সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে `স্মৃতি চিরন্তন` শিরোনামে নাম ফলক।

এর নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৮৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি; দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এর নির্মাণ সমাপ্ত হয়। স্মৃতিফলকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারী যারা শহীদ হয়েছিল, তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মোট ১৪টি দণ্ডায়মান প্রাচীরের গাত্রে বসানো হয়েছে পোড়ামাটির ফলক, যার মধ্যে আকারে ৬টি ছোট এবং ৮টি অপেক্ষাকৃত বড়।

প্রথম দুটি ফলকে যথাক্রমে উত্কীর্ণ করা আছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের রচনা থেকে দুটি পঙক্তি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদদের স্মারক নিদর্শন নির্মাণের জন্য প্রথমে প্রকল্পটি ছিল স্থপতি আব্দুল মোহায়মেন ও মশিউদ্দিন শাকেরের তৈরি। প্রথম পর্যায়ে যদিও টেরাকোটা সন্নিবেশ করার কোনো পরিকল্পনা ছিল না, পরবর্তী সময়ে কাজের অগ্রগতির সাথে সাথে টেরাকোটার বিষয়টি সংযোজন করেন চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক আবু সাইদ তালুকদার ও শিল্পী রফিকুন নবী।

৩০ এপ্রিল ২০১৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এর সংস্কার ও উন্নয়নের কাজ হাতে নেয়। সংস্কার করার সাথে সাথে স্মৃতি চিরন্তনের সৌন্দয বর্ধনের উদ্দেশ্যে এখানে একটি দৃষ্টিনন্দন পানির ফোয়ারা নির্মাণ করা হয়েছে।

স্মৃতি চিরন্তর সম্পর্কে আরও জানতে পড়ুন মুক্তিযুদ্ধ, ঢাবি এবং স্মৃতি চিরন্তন

 

   

মধুসূদন দে স্মৃতি ভাস্কর্য

 

মধুসূদন দে স্মৃতি ভাস্কর্য: 

বাংলাদেশের বহু ছাত্র আন্দোলন ও সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু মধুর ক্যান্টিন। মধুসূদন দে যিনি মধুদা নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন, তাঁর নাম অনুসারে এই ক্যান্টিনটির নামকরণ করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে অতর্কিত হামলা চালিয়েছিল তাতে শহীদ হন মধুসূদন দে। তাঁর স্মৃতি স্মরণ রাখতেই মধুর ক্যন্টিনের ফটকের সামনে তৈরি করা হয় এই ভাস্কর্য।


১৯৯৫ সালের ১৮ এপ্রিল ভাস্কর্যটি উদ্বোধন করা হলেও পরবর্তিতে এর পুনঃনির্মাণ করা হয় ২০০১ সালের ২৭ মার্চ। এর ভাস্কর হচ্ছেন মো. তৌফিক হোসেন খান।

 



রাজাকার ঘৃণাস্তম্ভ ভাস্কর্য

রাজাকার ঘৃণাস্তম্ভ ভাস্কর্য:

২ ফুট উচ্চতার কালো রঙের একটি স্তম্ভ। মাথায় টুপির আদলে ত্রিভুজাকৃতি করা। কুৎসিত এ স্তম্ভটি রাজাকারের প্রতীক। একাত্তরের রাজাকারের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শনের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ক্যাফেটেরিয়ার সামনে এই ‘ঘৃণাস্তম্ভ’টি নির্মাণ করা হয় ২০০৭ সালে। এর তিন পাশে লেখা রয়েছে রাজাকার, আল বদর ও আস শামস। ভাস্কর্যের পেছনে লেখা রয়েছে- `ঘৃণাস্তম্ভে রাজাকারদের ধিক্কার জানান`৷ এই পথে চলাচল করা হাজারো শিক্ষার্থী রাজাকার বিদ্বেষী মনোভাব নিয়ে এখানে থুথু ও ময়লা-আবর্জনা ফেলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নির্মিত এ ভাস্কর্যটি কয়েক বছর ধরে জঞ্জালে ঢাকা পড়ে ছিল। কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পর পরই রাজাকার ঘৃণাস্তম্ভটির আয়তন বাড়ানো হয়।

২০০৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর নির্মাণের পর ২০১৩ সালে দুর্বৃত্তরা এটি ভেঙ্গে দেয়। ঐ বছরই বিজয় দিবসে রাজাকার স্তম্ভটি নতুন করে সংস্কার করা হয়।

 

সপ্তশহীদ স্মৃতিস্তম্ভ

সপ্তশহীদ স্মৃতিস্তম্ভ:

দেখতে মোটেই ভাস্কর্যের মত নয় এটি। তবুও সাতজন বীরের প্রতিমূর্তি ভাস্কর্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক শহীদুল্লাহ হল পুকুরের পূর্ব পাড়ে। মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর শিক্ষার্থীদের ছিল যুগান্তকারী ভূমিকা। তাদের অবদানকে স্মৃতিপটে ধারণ করে রাখতে এই স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে ফজলুল হক মুসলিম হলে। এ সপ্তশহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নামক ভাস্কর্যটি সাতজন বীরশ্রেষ্ঠকে নিয়ে নয়। ৭১ এ শহীদ হওয়া সাতজন বীরকে নিয়ে যারা এই হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন।

 


প্রত্যাশা

প্রত্যাশা:

প্রত্যাশার ভাস্কর হচ্ছেন মৃণাল হক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আনোয়ার পাশা ভবনের কাছেই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখতে তৈরি করা হয় ভাস্কর্য ‘প্রত্যাশা’।

ভাস্কর্যগুলো প্রতিনিয়ত আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে জানার প্রেরণা যুগিয়ে চলেছে।

 

(ছবি: তন্ময়, মুস্তাফিজ, তাহমিনা ও খাইরুজ্জামান)

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম/তন্ময়-মুস্তাফিজ