Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

রহস্যে ঘেরা শহীদুল্লাহ হলের পুকুর

মো: মাহদী-আল-মুহতাসিম নিবিড়

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ০৩:২৩ পিএম, ২৩ আগস্ট ২০১৭ বুধবার | আপডেট: ০২:৫৩ পিএম, ১৮ অক্টোবর ২০১৭ বুধবার

প্রায় প্রতিবছর কেউ না কেউ এ পুকুরে ডুবে মারা যায়।

প্রায় প্রতিবছর কেউ না কেউ এ পুকুরে ডুবে মারা যায়।

আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত বারমুডা ট্রায়াঙ্গল নিয়ে প্রচলিত রয়েছে অনেক কাহিনী। জানা যায়, ঐ স্থানের ওপর দিয়ে কোন নৌযান যাওয়ার চেষ্টা করলে তা সমুদ্রের অতল গভীরে হারিয়ে যায়; উড়োজাহাজ গমন করলে রাডারে তার অবস্থান মেলে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের পুকুর নিয়েও রয়েছে তেমনি এক অজানা রহস্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে প্রাচীন হলগুলোর মধ্যে একটি এই শহীদুল্লাহ হল, যা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে। হলের পাশেই অবস্থিত এই বড় পুকুরটি, যা একটি রহস্যময় মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। প্রায় প্রতিবছর কেউ না কেউ এ পুকুরে ডুবে মারা যায়।

হলের কর্মচারীরা জানায়, এই পুকুরে সাঁতার কাটতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে মারা গেছে বিশ্বাবিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী। তাই পুকুরটিকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশ-পাশের এলাকায় প্রচলিত আছে নানা গল্প। কেউ কেউ বলে এই পুকুরে ভূত-প্রেত বা জীন আছে, আবার কেউ বলে এতে রয়েছে অভিশপ্ত আত্মার চরাফেরা। আবার অনেকেই দিতে চান বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।

পুকুর পাড়ের চার পাশে সবুজের সমারোহ। দুই পাড়ে রয়েছে তিনটি ঘাট। বিকেলে গাছের ছায়ায়, সবুজ ঘাসের ওপর বসে গল্পে মেতে ওঠার জন্য এ এক চমৎকার জায়গা। গরম আবহাওয়ায় হয়তো কারো মন চায় পুকুরটিতে সাঁতার কেটে বা গোসল করে মন জুড়াতে। কিন্তু সে আনন্দ মাঝে মাঝেই পরিণত হয়েছে বিষাদে। ভেসে উঠেছে তরতাজা প্রাণের নিথর মৃতদেহ।

সর্বশেষ এ পুকুরটির শিকারে পরিণত হয় এ হলেরই আবাসিক ছাত্র বায়েজিদ বোস্তামী। গত ৫ই এপ্রিল, ফলিত পরিসংখ্যান বিভাগের প্রথম বর্ষের এ ছাত্রটি ফুটবল খেলার পর ক্লান্ত হয়ে সন্ধায় তার বন্ধুদের সাথে পুকুরে নামে। সবাই উঠে এলেও, বায়েজিদ পুকুরের মাঝ থেকে তলিয়ে যায়। মৃতদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। পরে ছাত্রটির অভিভাবক গ্রামের বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ে ছেলের লাশ নিয়ে যান।  

এর আগে গত বছর ১৩ই আগস্ট মোহাম্মদ আলী নামে এক স্কুলছাত্র পুকুরে গোসল করতে নেমে মারা যায়। ঐ বছর ফেব্রুয়ারিতেই পুকুরটিতে অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ পাওয়া যায়। ২০১৫ সালের ১৩ই মে, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্র হায়দারী মাহফুজুল্লা রাহী পুকুরটিতে ডুবে মারা যায়। এর আগে ২০০৯ সালে এই পুকুরে সাঁতার কাটার সময় দুপুর বেলায় পানির নীচে তলিয়ে যায় এক ভর্তি পরীক্ষার্থী। এর পূর্বে বন্ধুর সাথে গোসল করতে এসে মারা যায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। গত ৩০ বছরে প্রায় ১৫ জন এ পুকুরে ডুবে মারা গেছে বলে হলের কর্মচারীরা জানান। এসব কারণে পুকুরটিকে ঘিরে নানা কল্পকাহিনী আরো বেশি প্রচলিত।

হলের প্রবীন কর্মচারী আব্দুর রশিদ বলেন, “চাকরিজীবনে অনেকের লাশ দেখলাম। ক্যাম্পাসে তো আরো পুকুর আছে, কিন্তু এ পুকুরটাতেই সবাই ডুবে মরে। মনে হয়, পুকুরের মাঝ থেকে কেউ লাশ টেনে নিয়ে যায়। অনেক আগে এক রাতে বরশি দিয়ে মাছ ধরছিলাম, দেখি বড় আকারের কি যেন ভেসে উঠছে। ভয় পেয়ে সেখান থেকে দৌড় দেই।”

সাঁতার কাটতে গিয়ে এক ছাত্রের মৃত্যুর পর পর এখানে গোসল করা ও সাঁতারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে নোটিশ টাঙিয়ে দেওয়া হয়। ঘাটের পাশে একটি সাইনবোর্ডে বড় বড় অক্ষরে বিজ্ঞপ্তি আকারে লেখা আছে-‘পুকুরে গোসল ও সাঁতার কাটা নিষেধ’।

মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাদেকুল ইসলাম এ হলেই থাকেন। তিনি বলেন, “অনেকেই এটি ভৌতিক পুকুর বলে মনে করে। তবে এই পুকুরের নিচে উদ্ভিদের পরিমাণ বেশি হওয়ায় পানিতে অক্সিজেন স্বল্পতা রয়েছে বলে শুনেছি। হয়তো সে কারণে সাঁতার কাটতে গিয়ে অনেকে মারা গেছেন।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এম আমজাদ আলী বলেন, “পুকুরটিতে প্রায় প্রতি বছর কোন না কোন ছাত্র ডুবে মারা যাচ্ছে। সাইনবোর্ডে নিষেধাজ্ঞা থাকার পরেও, তারা পুকুরে নামে। সকলের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরী।”