Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

‘শিক্ষক আনন্দ পান যখন ছাত্রছাত্রীরা তাকে ছাড়িয়ে যায়’

আফসানা স্বর্ণা ও শ্রাবণী মন্ডল

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ০৭:১৫ পিএম, ১ আগস্ট ২০১৮ বুধবার | আপডেট: ০৩:৩০ পিএম, ২ আগস্ট ২০১৮ বৃহস্পতিবার

‘শিক্ষক আনন্দ পান যখন ছাত্রছাত্রীরা তাকে ছাড়িয়ে যায়’

‘শিক্ষক আনন্দ পান যখন ছাত্রছাত্রীরা তাকে ছাড়িয়ে যায়’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ২ আগস্ট। এ বিভাগ থেকেই তৈরি হয়েছে স্বনামধন্য অনেক সাংবাদিক, শিক্ষক। অনেকেই রয়েছেন আরও নানা পেশায় নিয়োজিত। বিভাগের অন্যতম একজন নন্দিত শিক্ষক ড. শেখ আব্দুস সালাম। বিভাগে তার পা পড়েছিল একজন ছাত্র হিসেবে। অর্থনীতি থেকে ডিগ্রি লাভের পর জ্ঞানপিপাসু মনের তৃষ্ণা মেটাতেই ছাত্র হিসেবে আবার এসেছিলেন সাংবাদিকতা বিভাগে। পরবর্তীতে একই বিভাগের শিক্ষক হয়ে বিভাগের সাথে সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে। বিভাগের অন্যান্য সবার মধ্যে, প্রবীণ হতে নবীনদের মাঝে সেতুবন্ধন তৈরিতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাও তিনি।
বিভাগের সাথে এতদিনের পুরনো সব অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির গল্প শুনবার জন্যই ডিইউএমসিজেনিউজ মুখোমুখি হয় অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালামের।

বিভাগকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ফিরে গেলেন তাদের সময়কার সোনালি সব দিনগুলোতে। স্মরণ করলেন বিভাগের অন্যতম শিক্ষক প্রয়াত এ কিউ এম নুরুদ্দিন স্যারকে। তাঁকে নিয়ে কথা বলতে শেখ আবদুস সালামের কণ্ঠে ঝরে পড়ছিল অপরিসীম শ্রদ্ধা।

তিনি বলেন, স্যার ন’টা হলে ন’টাতেই আসতেন। ঠিক পাঁচটায় উনি উনার রুম টা বন্ধ করতেন। উনি সবসময় পাণ্ডিত্যের মোহে আমাদের মুগ্ধ করে রাখতেন বিষয়টি তেমনও নয়। বরং জীবনের অন্যান্য গল্প ক্লাসে শোনাতেন আর তাতেই আমরা মুগ্ধ হতাম বেশি।

অধ্যাপক শেখ আবদুস সালাম বলেন, ‘শিক্ষকতার মূলত দুটি দিক। এক হচ্ছে শিক্ষকের চলন-বলন আদর্শবাদিতা, আর এক হচ্ছে তার পাণ্ডিত্য। তো সব শিক্ষক যে পণ্ডিত শিক্ষক হবেন তেমনটা নয়। কাজেই আমি শুধু শিক্ষকদেরকে তার পাণ্ডিত্য দিয়ে পরিমাপ করতে চাইনা। তার চালচলন, তার জীবনবোধ, বিভাগের প্রতি, ছেলেমেয়েদের প্রতি তার মমত্ববোধ, আইডিয়ালিজম এই বিষয়টিকে তিনি কতখানি নারিশ করেন সেটাও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

বিভাগের অপর প্রাক্তন শিক্ষক অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান কে নিয়ে বলেন, স্যার আমাদের তখন সবচেয়ে ইয়াং শিক্ষক। আমি সরাসরি কিন্তু স্যার এর ছাত্র ছিলাম। ফলে দেখতাম যে বিভাগে এমন কোন কাজ নেই যাতে উনি জড়িত নন। আর সবকাজেই তার ছিল অপরিসীম উৎসাহ’। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিককে নিয়েও জানালেন অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা।

তবে পরের দিকে খানিকটা আক্ষেপের সুরেই যেন বললেন- আগে ছাত্র শিক্ষক সম্পর্কে যে দৃঢ়তা ছিল তা আজ অনেকাংশেই যেন দুর্বল হয়ে পড়েছে। সময়ই হোক, অথবা এখনকার পড়াশোনার ব্যবস্থাই হোক আগের মতন হৃদ্যতা আর ভালোবাসার ঘাটতিই দেখতে পাই। কথায় কথায় বললেন, এখনকার পড়াশোনা ক্যারিয়ারকে ভিত্তি করেই বেশি হয়। ফলে ছেলেমেয়েরা ভাবে তারা নিজেরাই সব বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, শিক্ষকের পরামর্শের দরকার নেই। এই সময়কার নিয়ম হয়তোবা এইটাই। আমরা শিক্ষকের পরামর্শ নিয়েই পথ চলতাম, বলেন অধ্যাপক শেখ আবদুস সালাম।

এখনকার শিক্ষকতা অনেকটা ‘চাকরি’তে পরিণত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন এই শিক্ষক। তিনি বলেন, অনেক শিক্ষকের মুখেই আমি এমন মন্তব্য করতে শুনেছি।

ছাত্র-ছাত্রিদের নিয়ে কি ভাবেন জিজ্ঞেস করাতে স্মিত হেসে বললেন, ‘চাণক্যের একটা কথা আছে মানুষ জিতে আনন্দ পায়। কিন্তু দুই ধরনের মানুষ হেরে আনন্দ পায় সে্টা হচ্ছে কোন পিতামাতাকে সন্তান যদি ছাড়িয়ে যায় তবে পিতামাতা আনন্দ পায় আর শিক্ষক আনন্দ পায় তার ছাত্র ছাত্রীরা কখনো যদি তাকে ছাড়িয়ে যায়।

বিভাগে পড়িয়েছেন এখন দেশে-বিদেশে অনেক উচ্চ স্থানে রয়েছেন এমন শিক্ষার্থীদের কথা স্মরণ করলেন শেখ আবদুস সালাম।

নিজেকে অনেকটাই ভাগ্যবান ভাবেন অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম। তিনি বলেন, ‘এক দিক দিয়ে আমরা খুশি যে যাদের হাত দিয়ে বিভাগটি গড়ে উঠেছে আমরা সেইসব শিক্ষকদেরই পেয়েছি। আবার আমরা যাদের পড়িয়েছি তারাও এখন শিক্ষক হয়েছে, কিংবা অন্য কোথাও বড় বড় পদে কাজ করছে।’

‘সময়ের বিবর্তনে বিভাগ শুধু বড় হয়নি, আধুনিকও হয়েছে’ এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, এর পরেও একটা জিনিস আমাকে একটু পীড়া দেয় যে, আমরা আমাদের জার্নালিজম ফ্যমিলি বলতে যা বুঝতাম তা অনেকটা ন্যাচারাল ছিল, হৃদ্যতায় ভরা ছিল। কিন্তু এখন এই রিলেশনে একটা কসমেটিকসের আবরণ পড়েছে বলে মনে হয়।

বর্তমান ছাত্রদের উদ্দেশ্যে অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা এখন পড়াশোনার ভিতরে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে পারছে না। জ্ঞানের চর্চায় তাদের বিচরণ আমার কাছে কম মনে হয়।

তবে তার মতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে মান আরও বেড়েছে, ফলে নবীনদের ভালো কিছু করবার সুযোগও বেড়েছে।

নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে শেখ আবদুস সালাম বলেন, ‘সুযোগগুলাকে আমরা যেন সত্যিকারের সুযোগ হিসেবেই কাজে লাগাই’।

ডিইউএমসিজেনিউজ/১ আগস্ট ২০১৮