Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

সমস্যায় জর্জরিত কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি

সাইয়েদুজ্জামান

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ০২:৫৭ পিএম, ১৬ আগস্ট ২০১৭ বুধবার | আপডেট: ০৩:১২ পিএম, ১৮ অক্টোবর ২০১৭ বুধবার

কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে দীর্ঘ লাইন। ছবি: সাইয়েদুজ্জামান

কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে দীর্ঘ লাইন। ছবি: সাইয়েদুজ্জামান

এদেশের শীর্ষ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি আজ চাকুরি প্রার্থীদের দখলে। ফলে সুবিধা বঞ্চিত হচ্ছেন বর্তমান শিক্ষার্থীরা। ফাঁকি দিয়ে বহিরাগত চাকুরি প্রার্থীদের প্রবেশ ঠেকাতে র্ব্যথ হচ্ছেন কর্তৃপক্ষ।

এখানে ডিজিটাল গেট চালু করা হলেও ই-লাইব্রেরি র্কাড এখনো ইস্যু করা হয়নি। ক্যাম্পাসের শব্দ দুষণের ফলে লাইব্রেরিতে পড়াশুনার পরিবেশ নেই বললেই চলে। অন্যদিকে শৌচাগার ও পানি সংকট, ফটোকপি ভোগান্তি, আড্ডা-হৈচৈ, লাইব্রেরি সম্মুখে অবৈধভাবে গাড়ি পার্কিং এর কারণে বিপর্যস্ত লাইব্রেরির স্বাভাবিক পরিবেশ ।

ভোর ছয়টা বাজতেই সকল চাকুরি প্রত্যাশীদের ভীড় জমে যায় এখানে, উদ্দেশ্য একটা আসন দখল করা। এটি প্রতিদিনের একটি সাধারন দৃশ্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীসহ বহিরাগতরা এসে এভাবে ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিয়োগ পরীক্ষাসহ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের অধীনে বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার জন্য আসন দখল করে লাইব্রেরিকে ব্যবহার করে থাকেন। অথচ লাইব্রেরিতে এসে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের অনেকেই বসার স্থান পান না,`এমনটাই অভিযোগ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীদের অনেকেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মেহেদি হাসান রাজিব আমাদের এমসিজে নিউজ পোর্টালকে বলেন, "লাইব্রেরিতে পড়াশুনার সুষ্ঠু কোন পরিবেশ নাই। ক্যাম্পাসের  যানবাহনের  কোলাহলে ও বহিরাগতদের উৎপাতে  লাইব্রেরিতে  পড়াশুনার  কোন  ভাল পরিবেশ  নাই"। ফার্সি  বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের  শিক্ষার্থী শামিম হাসানও একই অভিযোগ করেন।

এই লাইব্রেরি যখন চালু হয়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল দুই হাজারের মতো, আর বই ছিল আট হাজার। এখন শিক্ষার্থী ৩৭ হাজার আর বইয়ের সংখ্যাও সাত লাখ ছাড়িয়েছে অনেক আগেই। সঙ্গত কারণেই উৎসাহী সব শিক্ষার্থী এসে বসতে বা পড়তে পারেন না, নোট নিতে পারেন না। তাকের বই তাকেই থাকে। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি  পড়ূয়াদের মধ্যে চাকরি প্রার্থীরাই বেশি। স্নাতক শেষ করে তারা ব্যস্ত এমপি থ্রি সিরিজের বই মুখস্থ করতে। হাতে-বগলে-ব্যাগে করে বিভিন্ন চাকরি লাভের সহজ উপায় হিসেবে ব্যবহৃত সংক্ষিপ্ত আকারের বই নিয়ে লাইব্রেরিতে আসেন তারা। দিনভর অধ্যয়ন শেষে চলে যান। শিক্ষার্থী যারা আসেন, তাদের অনেকের কাছে থাকে সুনির্দিষ্ট পাঠ্যবই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে থাকা বইয়ের ব্যবহার তাই নেই বললেই চলে। সময় নেই তাদের আলমারিতে রাখা বইয়ের দিকে নজর দেওয়ার। শিক্ষকদের কাছ থেকেও নতুন রেফারেন্স বইয়ের পরামর্শ তারা পান না তেমন। তাই ধুলোর স্তূপ জমছে লাইব্রেরির তাকে রাখা বইয়ে। অথচ ইতিহাস বলে, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিই একসময় ব্যবহার করেছেন সত্যেন বোস, যদুনাথ সরকার, রমেশচন্দ্র মজুমদার, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার সেন, কাজী মোতাহার হোসেন, আব্দুর রাজ্জাক, মুহাম্মদ হাসান দানি, মুনীর চৌধুরী প্রমুখ বিদ্বান। কয়েকজন শিক্ষার্থী জানালেন, শিক্ষকরাও লাইব্রেরিতে আসেন না খুব একটা। এলেও বই নবায়ন করে কিংবা নতুন বই নিয়ে চলে যান। এক কথায়, অনুসন্ধিৎসু হয়ে এ লাইব্রেরি কেউ আর ব্যবহার করেন না বললেই চলে। জ্ঞান সাধনার বর্তমান পরিস্থিতি ঠিক এতটাই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

বর্তমানে এখানে প্রায় ছয় লাখ ৭৪ হাজার ৫৩৮টি বই ও সাময়িকী আছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, যুগোপযোগী বই না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫ হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষার চাহিদা পরিপূর্ণভাবে মেটাতে পারছে না কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো লাইনের শেষ নেই। ভর্তির লাইন, হলে আসনের লাইন, ডাইনিংয়ের লাইনের মতোই আরেকটা লাইন হলো কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে ঢোকার লাইন। দেশের বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার এক করুণ চিত্র ধরা পড়ে এ লাইন দেখলে। ভেতরেও পড়ালেখার উপযুক্ত পরিবেশ নেই বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের মতে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যাবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্রন্থাগারের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা হয়নি। তাই দরকারি বইয়ের চাহিদাপত্র দিলেও `নেই` বলে জানিয়ে দেন গ্রন্থাগারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বর্তমানে গ্রন্থাগারে আসন সংখ্যা এক হাজার একশটি। এসবের অনেক আসনই আবার ব্যবহারের অনুপযুক্ত। চাপাচাপি করে হলেও তাই দেড় হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করতে পারেন না কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে।

অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রায় ৩৭ হাজার। এর মধ্যে কলা, সামাজিক ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের প্রায় ২১ হাজার শিক্ষার্থী এ লাইব্রেরি ব্যবহার করে থাকেন। এত শিক্ষার্থীর জন্য এত স্বল্প আসন কল্পনাতীত। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন প্রতিদিন ভোর ৬টার দিকে ঘুম থেকে উঠেই লাইব্রেরিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হয়। কারণ সাড়ে ৭টার পর গেলে আর সিট পাওয়া যায় না। এই সামান্য সময়েই প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের সারি লাইব্রেরি থেকে ডাকসু ছাড়িয়ে যায়।

মেশিনের অপ্রতুলতায় ফটোকপি করতেও চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। দীর্ঘসময় পার করতে হয় বই কপি করতে। কপির জন্য বই দিলে প্রায়ই `আগামীকাল আসবেন` বলে রেখে দেন কর্মচারীরা। লাইব্রেরি কর্মচারীদের অনেকেই অদক্ষ। অনেকেই আছেন এসএসসি অথবা তার নিচের শ্রেণির। এসব কারণে অনেকেই ঠিকভাবে বুঝতে না পেরে বই ডেলিভারিও দিতে পারেন না। ফলে প্রায়ই ফটোকপি সমস্যায় পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের।

লাইব্রেরির পাশে বসেই শিক্ষার্থীরা আড্ডা দেন প্রতিদিন। সম্প্রতি লাইব্রেরির সামনের শোভা বর্ধন ও নতুন ক্যাফেটেরিয়া হওয়ায় এখানে শিক্ষার্থী ও বহিরাগতদের আড্ডা অনেকাংশে বেড়ে গেছে আর বেড়ে গেছে শব্দ দূষণের মাত্রাও। মধুর ক্যান্টিন কেন্দ্রিক ছাত্র সংগঠনসমূহের মিছিল মিটিংয়ের উচ্চ আওয়াজ লাইব্রেরিকেও স্পর্শ করে। আবার বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর সমাবেশের অন্যতম স্থান লাইব্রেরি চত্বর। এসব কারণে লাইব্রেরি পড়ুয়াদের মনোসংযোগে প্রায়ই বিঘ্নের সৃষ্টি হয়। এমনকি লাইব্রেরিতে আওয়াজ করে কথা বলা, গল্প করা, ফোনালাপ, চেয়ার টানাটানি ইত্যাদি নিষিদ্ধ থাকলেও এসবের নেই কোনো কার্যকারিতা। আবার লাইব্রেরিতে সবাই যে পড়তে আসেন, তাও কিন্তু নয়। অনেকেই দল বেঁধে লাইব্রেরিতে এসে পড়াশোনার বদলে গল্প শুরু করেন। কেউবা প্রাইভেট পড়ানোর কাজটাও সারেন এ লাইব্রেরিতে বসেই! আবার অন্যের জন্য আসন দখল করে রাখার দৃশ্য প্রায়ই চোখে পড়ে!

লাইব্রেরিতে ঢুকতেই প্রথম তলার বাথরুমের দরজা থেকে ভেতর পর্যন্ত কাদামাখা স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ যে-কাউকে অসুস্থ করে তোলে। সেই সঙ্গে রয়েছে টয়লেটের অসহনীয় দুর্গন্ধ। টয়লেটের সিলিন্ডারসহ আশপাশে ছড়িয়ে থাকে ব্যবহৃত টিস্যু। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার টয়লেটগুলোরও একই অবস্থা। শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত আসন-সংকট নিরসনের পাশাপাশি পর্যাপ্তসংখ্যক শৌচাগারের ব্যবস্থা করা এবং এর সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ডিজিটাল গেট চালু করা হলেও ই-লাইব্রেরি র্কাড ইস্যু করা হয়নি এখনও, যার কারণে অবৈধ অনুপ্রবেশকে কোনোভাবেই ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না।

যানবাহনের কোলাহলে বিপর্যস্ত পড়াশোনার পরিবেশ গাড়ির হর্ন, মিছিলের শোরগোলে নষ্ট হচ্ছে ক্যাম্পাসের পরিবেশ। ঢাকা  বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত লাইব্রেরিয়ান সৈয়দা ফরিদা পারভিন এমসিজে নিউজ  র্পোটালকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, "লাইব্রেরিতে এসি থাকায় এখানে আসতে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বেশি থাকে। সমস্যা তখনই  হয় যখন বহিরাগত ও সাবেক শিক্ষার্থীরা এসে জায়গা দখল করে"। তিনি বলেন, "আমরা ডিজিটাল গেট চালু করেছি কয়েক মাস আগেই, কিন্তু ই-লাইব্রেরি র্কাড প্রস্তুত না হওয়ায় র্বতমান শিক্ষার্থীরা এর সুফল পাচ্ছেন না"। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, অতি দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করা হবে, কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।