Dhaka University Mass Communication and Journalism Department News Portal

স্পর্শের আলো!

ইসতিয়াক আহমেদ

ডিইউএমসিজেনিউজ.কম

প্রকাশিত : ০৯:৩৯ পিএম, ৬ নভেম্বর ২০১৭ সোমবার | আপডেট: ০২:১৭ পিএম, ১৫ নভেম্বর ২০১৭ বুধবার

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের রিসোর্স সেন্টার, ঢাবি

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের রিসোর্স সেন্টার, ঢাবি

‘এখানে শুধু পড়া রেকর্ড করতে আসি। রেকর্ডিং-এর কাজ না থাকলে এখানে আসা হয় না। বই সেভাবে নেই, থাকলেও তা অনেক পুরনো ভার্সনের। সেগুলো দিয়ে কাজ হয় না’। কথাগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের রিসোর্স সেন্টার’ সম্পর্কে বলছিলেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী টিটো।

২০০৭ সালে ‘সাইট সেভারস’ নামের একটি বিদেশি সংস্থার অর্থায়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে এই সেন্টার গড়ে তোলা হয়। এখানে ‘ব্রেইল’ পদ্ধতির মাধ্যমে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া করে থাকেন।

‘ব্রেইল’ শব্দটির পেছনে রয়েছে অনেক ইতিহাস। ব্রেইল হচ্ছে এমন একটা পদ্ধতি যার সাহায্যে দৃষ্টিহীনরা স্পর্শের মাধ্যমে লিখতে এবং পড়তে পারেন। ফরাসি লুই ব্রেইল নামের একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি ১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দে এই পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। তার নামানুসাররে এই পদ্ধতির নামকরণ করা হয় ‘ব্রেইল’ পদ্ধতি।

ব্রেইল পদ্ধতিতে একটি চতুর্ভুজ আকৃতির বক্সে ছয়টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র থাকে ৩ x ২ কলামে। অর্থাৎ নিচের দিকে তিনটি এবং পাশাপাশি দুটি। প্রতিটি ছিদ্র এক একটি বর্ণ, সংখ্যা নির্দেশ করে। এই ছয়টি খালি ছিদ্রের মধ্যে একটু উঁচু বা পুর্ণ যেগুলো থাকে সেগুলোই হচ্ছে বর্ণ বা সংখ্যা চেনার নির্দেশক।

‘দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের রিসোর্স সেন্টার’ এর সহকারী গ্রন্থাগারিক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন মোহাম্মদ সারোয়ার হোসেন খান। যিনি নিজেও একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর তিনি বাংলাদেশের প্রথম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী হিসেবে এমফিল ডিগ্রী অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি একই প্রতিষ্ঠানে পি এইচ ডি শিক্ষার্থী হিসেবে অধ্যয়ন করছেন।

ব্রেইল পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা সাধারণ মানুষের মতো দেখতে পাই না। আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি একটু আলাদা। অন্যরা যেভাবে দেখে দেখে পড়ে আমরা তা পারি না, আমরা জ্ঞানের আলো পাই স্পর্শের মাধ্যমে”।

বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭০ জনের মতো দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন বলে তিনি জানান। যাদের অধিকাংশ রাষ্ট্রবিজ্ঞান, শিক্ষা ও গবেষণা, সমাজবিজ্ঞান, দর্শন ইত্যাদি বিভাগে অধ্যয়নরত।

রিসোর্স সেন্টারের সম্পদের অপ্রতুলতা নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে তিনি জানান, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের রিসোর্স সেন্টারটির মাত্র একটি কক্ষ রয়েছে। যা একই সাথে পাঠকক্ষ, অফিস ও অনুসাঙ্গিক সকল কাজ করতে ব্যবহৃত হয়। যার কারণে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় অসুবিধা হয়। তার উপর রয়েছে প্রয়োজনীয় বইয়ের অপ্রতুলতা। সকল বিভাগের প্রয়োজনীয় একাডেমিক বই এখানে পাওয়া যায় না। ফলে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

রিসোর্স সেন্টারটিতে রয়েছে কম্পিউটার, বই, ব্রেইল প্রিন্টার ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। সার্বিক তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত আছেন ৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী।

বাংলাদেশে স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনী নামের একটি প্রতিষ্ঠান ব্রেইল বই প্রকাশ করে থাকে। যারা এই রিসোর্স সেন্টারে ২০১৫ সালে ব্রেইল বই, অডিও সিডি ও অন্যান্য শিক্ষা সরঞ্জাম প্রদান করেছে।

সারোয়ার হোসেন খান সরকার ও সামাজের বিত্তশালী লোকদের দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা বিস্তারের জন্য সহায়তা করার অনুরোধ জানান। তিনি ব্রেইল পদ্ধতিতে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে শিক্ষার সকল স্তরে এই পদ্ধতির প্রসারের আহবান জানান যাতে করে সকল দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার সুযোগ পায়।